বাংলাদেশি সন্দেহে আসামের বন্দিশিবিরে ভারতীয় নারীর ৩ বছর

 

 

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

ভারতের আসামে মধুবালা মণ্ডল নামে এক নারীকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে তিন বছর ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখার পর ভুল স্বীকার করে তাকে মুক্তি দিয়েছে পুলিশ। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামের চিরাং জেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা ৫৯ বছরের মুধবালা যখন বাড়ি ফেরেন তখন তার মেয়ে আর নাতনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না।

২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী ‘অনুপ্রবেশকারী’ বাছাইয়ের কাজে শুরু করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তখন দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশি অনুপ্রেবশকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান রয়েছে যে রাজ্যে সেই আসাম থেকেই এই বাছাইয়ের কাজ শুরু করা হবে।

সে অনুযায়ী আসামে নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ওই নাগরিকপঞ্জির খসড়া প্রকাশের পর দেখা যায় সেখানে এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের ঠাঁই হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কের পর জুলাইয়ে দ্বিতীয় খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে নাগরিক হিসেবে দুই কোটি ৮৯ লাখ মানুষের নাম তালিকায় রাখা হয়। অথচ আবেদন করেছিলেন তিন কোটি ২৯ লাখ মানুষ।

আসামে এই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বাছতে গিয়ে বহু ভারতীয়কে হেনেস্তার শিকার হতে হচ্ছে, যাদের একজন মধুবালা। ২০১৬ সালে আসাম পুলিশ মধুবালাকে ‘বিদেশি’ বলে আটক করে। যদিও পুলিশ আসলে মধুমালা দাস নামে একজনকে খুঁজছিলেন, যিনি প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন। নানাভাবে চেষ্টা করেও মধুবালা মণ্ডল নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে পারেননি। অবশেষ পুলিশ তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং মুক্তি মেলে মধুবালা মণ্ডলের।

মুক্তি পাওয়ার পর এনডিটিভিকে মধুবালা বলেন, পুলিশ আসার পর আমি তাদের বার বার বলেছিলাম আমি মধুবালা, মধুমালা নই। তাছাড়া আমার টাইটেল মণ্ডল, দাস নয়। কিন্তু তারা আমার কোনো কথা না শুনে ধরে নিয়ে যায়। ডিটেনশন সেন্টারে তিন বছর আমি অনেক কষ্ট করেছি।

প্রায় ২২ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর মধুবালাই তিন সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার মেয়ে ফুলমালা (৩৪) বোবা হওয়ায় আট বছর আগে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে একমাত্র মেয়ে জয়ন্তীকে (১২) নিয়ে মায়ের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।

ডিটেনশন সেন্টারের বর্ণনা দিতে দিয়ে মধুবালা বলেন, সেখানে জীবন ভয়াবহ। শত শত মানুষের সঙ্গে সেখানে অমানবিক ব্যবহার করা হয়। আমি মুক্তির আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমাকে ছাড়া আমার মেয়ে আর নাতনির কী হবে সেটা ভেবে আমি কষ্ট পেতাম।

আমাদের সেখানে সবজি খেতে দেওয়া হত। মাঝে মধ্যে ভাত আর ডাল, সবই থাকতো আধাসিদ্ধ। ওখানে তরুণ-বৃদ্ধ অনেক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে যারা আসলে ভারতীয়। আমি নিজে সেখানে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা দুইজনকে মরে যেতে দেখেছি।

মধুবালাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ফুলমালা ও তার মেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। তবে ভাগ্য ভালো, কয়েকজন গ্রামবাসী তাদের পাশে দাঁড়ায়।

এক প্রতিবেশী বলেন, জয়ন্তী স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। আর ফুলমালা মায়ের খোঁজে পুরো গ্রাম পাগলের মত দৌড়ে আর চিৎকার করে বেড়াত। আমি মাঝে মধ্যে তাদের ধরে খাবার দিতাম।

এনডিটিভি লিখেছে, মধুবালার পরিবার বা তার গ্রামের মানুষের পক্ষে তাকে মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল না। ডিটেনশন সেন্টারেই হয়ত মধুবালার জীবন শেষ হয়ে যেত, যদি না স্থানীয় সমাজকর্মী অজয় কুমার রায় তার সাহায্যে এগিয়ে যেতেন। আসামের খসড়া নাগরিকপঞ্জিতে মধুবালার পুরো পরিবারের নাম আছে। তার ভারতীয় জাতীয়তার প্রমাণ জোগাড় করে অজয় কুমার সেগুলো পুলিশকে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আমি সব প্রমাণ পুলিশের এসপিকে দিই এবং বলি, তারা যেন আরেকবার গ্রামে গিয়ে প্রকৃত সত্যটা খুঁজে দেখেন। সানাউল­াহ নামে আরো এক ব্যক্তি ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আমি মধুবালার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সাহায্য চাই। তখন এটা নিয়ে হইচই শুরু হয়।

এ বিষয়ে চিরাং পুলিশের এসপি সুধাকর সিং বলেন, তদন্তে আমরা পরিচয় সনাক্তে ভুল হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আদালতে আমাদের প্রতিবেদন পাঠাই এবং তিনি মুক্তি পান।

একমাস আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সেনা মোহাম্মদ সানাউল­াকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে ১২ দিন ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে ভারতজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।

অশ্র“সিক্ত চোখে মধুবালা বলেন, তাদের ভুলের জন্য আমার পরিবার এবং আমার শরীর ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি তো এখন কাজও করতে পারব না, আমি এখন কিভাবে বেঁচে থাকবো? আমি এখন সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ চাই। আমাকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ কী তারা দিতে পারবে?

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.