তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে চাই সমন্বিত উদ্যোগ -জিনাত আরা আহমেদ

তথ্য অধিকার আইন সরকারী অফিসসহ সকল বেসরকারী অফিস, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যারা পাবলিক ফান্ড ব্যবহার করেন সবার জন্য প্রযোজ্য একটি যুগান্তকারী আইন। জনগণের অধিকার আদায়ে মাইলফলক তথ্য অধিকার আইন। জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক এটা আইনত বাস্তবে প্রমাণের একমাত্র হাতিয়ার তথ্য অধিকার আইন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সৃষ্ঠ কোন সংস্থা, সরকারের মন্ত্রণালয়-বিভাগ-কার্যালয়, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, সরকারী অর্থায়নে পরিচালিত কোন বেসরকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এমনকি বিদেশী সাহায্যপুষ্ট কোন বেসরকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানও তথ্য অধিকার আইনে তথ্য দিতে বাধ্য। বাংলাদেশ সীমানাভুক্ত উল্লেখিত সকল সরকারি-বেসরকারি দপ্তর জনগণের প্রয়োজনের উদ্দেশ্যে স্থাপিত। এসব দপ্তরে বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ যেয়ে থাকে। বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার যেমন মৌলিক অধিকার তেমনি তথ্য পাওয়ার অধিকারও এক অর্থে মৌলিক অধিকার। এটা মানবাধিকারের সমতুল্য।

গণতান্ত্রিক সরকারের মূল লক্ষ্যই নাগরিক সেবা। বর্তমান সময়ে সেবার সাথে সাথে তথ্যও নানা কারণে মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেবা সম্পর্কিত তথ্য না জানার ফলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন চিকিৎসায় কি কি সুবিধা রয়েছে, কত খরচ এবং কার কাছে যেতে হবে। এসব বিষয় না জানার ফলে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। ভোগান্তিতে পড়ে বহু মানুষের অর্থ, শ্রম, সময় নষ্ট হয়। উল্লেখ্য, সুশাসনের নিমিত্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া সাংবিধানিকভাবে তথ্য প্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই জনগনের ক্ষমতায়ন ও দুর্নীতি রোধে তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক।

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আমরা জানি, সকল সাধারণ তথ্য স্ব-প্রনোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। কার্যক্ষেত্রে বিনামূল্যে সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য সহজলভ্য করতে হবে এবং এর কপি নামমাত্র মূল্যে বিক্রয়ের জন্য মজুদ রাখতে হবে। বর্তমানে সব অফিসের সেবা কার্যক্রম ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি যতদূর সম্ভব সিটিজেন চার্টারে উল্লেখিত থাকে। এছাড়া সরকারি দপ্তরসমূহে স্টেকহোল্ডার মিটিং অর্থাৎ অংশীজনদের নিয়ে সভা করার কথা বলা আছে, এটা সেবা প্রদানে পারস্পরিক মতবিনিময়ের কার্যকরী পদক্ষেপ। জনগনের সেবা প্রাপ্তিতে ‘অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা’ নামে সরকারি দপ্তরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । এর মাধ্যমে সেবার গুণগত মান, পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ জানানো যায়। বর্তমানে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির আওতায় কাজের মান ও সেবা বিষয়ে কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে মূল্যায়ণ ও পরিবীক্ষণ করা হয়। সকল দপ্তরে প্রতি বছরের ক্রয় পরিকল্পনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এসব কার্যক্রমের একটাই লক্ষ্য, সেটা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

উল্লেখিত ব্যবস্থাসমূহের আইনগত ভিত্তি হল তথ্য অধিকার আইন। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলে নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ২০দিন অথবা ৩০দিনের মধ্যে তথ্য দেয়া বাধ্যতামূলক। সময়মত তথ্য না পেলে, কিংবা অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিলে আপিলের সুযোগ আছে। নির্ধারিত সময়ের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের পরবর্তী উর্ধ্বতন কার্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানের কাছে আপিল করা যাবে। ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না পেলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনে অভিযোগ জানানো যাবে।এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, বেশিরভাগ মানুষ সময়মত তথ্য না পেলে আপিল করেন না। আর যদিও বা আপিল করেন, এর প্রেক্ষিতে অনেকেই তথ্য কমিশনে অভিযোগ জানান না। তারা এটাকে সময়ক্ষেপণ মনে করেন ।

ভোগান্তি নিরসন ও সঠিক সেবা পাওয়ার মাধ্যমে জনকল্যাণকামী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হয়। যুগান্তকারী এই আইনটিকে জনকল্যাণে কাজে লাগাতে হলে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে সুধীজনদের। সমাজ সচেতনদের সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে আবেদন জানাতে হবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায়। এখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য পাওয়া, আপিলের প্রস্তুতি এবং পরবর্তীতে তথ্য কমিশনে আপিল আবেদনের সময়টিতে সচেতনতাই ব্যক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চাহিত তথ্য পেতে সময় লাগছে, এটা ভেবে পিছিয়ে আসলে দীর্ঘদিনের শক্ত হয়ে যাওয়া গিট কখনোই খুলবে না। তাই তথ্যের অধিকার আদায়ে নিতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ। সকলের একাত্বতায় গড়ে তুলতে হবে তথ্য প্রদানের সংস্কৃতি। তাহলেই জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে সুশাসনের অঙ্গীকার।

লেখক -জিনাত আরা আহমেদ, উপপ্রধান তথ্য অফিসার, পিআইডি খুলনা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *