কর্ণফুলী টানেলের লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখবে সংসদীয় কমিটি
দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টানেল প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও আর্থিক লোকসানের কারণ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখবে কমিটি। এ কাজে সংশ্লিষ্ট সবাই কমিটিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবেন।
বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও আলোচনা হয়। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, আমদানিনির্ভরতা, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে সমস্যা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দুর্বলতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব সমস্যা দূর করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব ২৮৮ প্রকল্পে : বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন তুলে ধরে বৈঠকে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৮৮টি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সংখ্যা ছিল ২৫৬। পরে আরও ৩২টি প্রকল্প যুক্ত হয়ে সংখ্যাটি ২৮৮ হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব আসা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বড়পুকুরিয়া-বগুড়া-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সাড়ে আট লাখ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন এবং ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় ও চতুর্থ ইউনিট রিপাওয়ারিং প্রকল্প।
এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, কঙ্বাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়।
এডিপির এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় হয়নি : বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতায় ১ হাজার ৪০২টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান ছিল।
অর্থবছর শেষে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দের ৩২ দশমিক ৪৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা যায়নি। ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৩০টির অর্থ ব্যয়ের হার জাতীয় গড়ের সমান বা বেশি ছিল। বাকি ২৬টির ব্যয় ছিল জাতীয় গড়ের নিচে।
সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় হয়েছে সংসদ সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে, ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের পাঁচটি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের আটটি প্রকল্পে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তিনটি প্রকল্পে ব্যয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ১৯টি প্রকল্পে ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ৩৫টি প্রকল্পে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্পে ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ১৬টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১২টি প্রকল্পে ৪২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং আইএমইডির চারটি প্রকল্পে ৪৩ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ১৮টি প্রকল্পে ব্যয়ের হার ছিল ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ২৩টি প্রকল্পে ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাতটি প্রকল্পে ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণ ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, ঠিকাদারের কাজ বন্ধ রাখা, জনবল সংকট, প্রকল্প সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি ব্যয়ে বিধিনিষেধের কারণে অনেক প্রকল্পে নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করা যায়নি।
তবে সব প্রকল্পে অর্থ কম ব্যয় হওয়ার কারণ কাজের অগ্রগতি কম থাকা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয় এবং রাজস্ব বাজেট থেকে খরচ বহনের কারণেও উন্নয়ন বাজেটের অর্থ অব্যয়িত রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা : উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর পেছনে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও বদলির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জটিলতার কার্যকর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয়ের বিধিনিষেধের প্রভাবও উঠে এসেছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, গত ৫ এপ্রিল অর্থ বিভাগের জারি করা নির্দেশনার কারণে কয়েকটি প্রকল্পে প্রশিক্ষণ, বিদেশ সফর, কম্পিউটার কেনা এবং অনাবাসিক ভবন নির্মাণ খাতে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করা যায়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ২২১ পদ শূন্য : বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জনবল ঘাটতি নিয়েও আলোচনা হয়। মন্ত্রণালয়ের ২২১টি শূন্য পদের বিপরীতে বিভিন্ন গ্রেডে ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়। এ সময় কমিটির সভাপতি শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কাজের চাপ ও প্রয়োজন বিবেচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের চেষ্টা চলছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কমিটির সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম এবং মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ উপস্থিত ছিলেন।
দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন/ জে এফ জয়

