কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারে ছয়জনসহ নিহত ১০
রিসোর্টের ম্যানেজার গ্রেপ্তার : ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে এ কথা জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম। নিহতদের মধ্যে এক পরিবারেরই ছয়জন থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের এসপি এ এন এম সাজেদুর রহমান।
তিনি বলেন, পরিবারটির নয়জন বেড়াতে এসেছিলেন। তিনজন সুস্থ আছেন। তারা দাবি করছেন, পরিবারের বাকি সদস্যরা নিখোঁজ রয়েছেন। আমরা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছি। তাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
ওই পরিবারের সদস্য আশিকুল ইসলাম কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, সকালে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। তার স্ত্রী আগুন দেখতে পেয়ে তাকে ডেকে তোলেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা অন্য স্বজনদের ডাকতে যান তিনি।
আশিকুল বলেন, তিনি দ্রুত একটি জানালা ভেঙে সেখান দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তার স্ত্রী আর বেরিয়ে আসতে পারেননি। পরে আশিকুল ইসলাম বলেন, আমরা একই পরিবারের ৯ জন ছিলাম। তিনজন বের হতে পারলেও ছয়জন ওই রিসোর্ট থেকে বের হতে পারেনি। এর মধ্যে আমার স্ত্রী, তার আপন বোন, খালাতো বোন, খালাত বোনের ছেলে, খালাত ভাইসহ ছয়জন ছিল।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯ জনের পরিচয় মিলেছে। এর মধ্যে এক পরিবারের ৬ জন রয়েছেন। তারা হলেন, ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। পরিচয় পাওয়া নিহত অন্য তিনজন হলেন ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম। শেষ দুজনের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এ অগ্নি দুর্ঘটনায় আহত নয়জন কঙ্বাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তারা হলেন-সায়ানুল মান্নান (৩৫), তার স্ত্রী ফাহমিদা (৩১); মাসুদ (৩০) ও তার স্ত্রী মেহেরুন্নেছা (৩০), ডা. শিহাব উদ্দিন সাদি (৩১), ডা. নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), আশিক (২৮), আইরিন ও ইমা।
সায়ানুল মান্নানের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, আমার ছেলে এবং বৌমা সুস্থ আছে। কক্সবাজারে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তারা দুপুরের পর বিমানে করে ঢাকার মিরপুরের পীরেরবাগ বাসায় এসেছে। ঢাকার বিমানবন্দরে নেমে অন্যের মোবাইল ফোন দিয়ে ঢাকায় পৌঁছার খবর দিয়েছে।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, আহতদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ, তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ পাঁচজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে বলে জানান উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আতিকুর রহমান মজুমদার।
কক্সবাজার শহরের প্রবেশদ্বার কলাতলী থেকে রিসোর্টটির দূরত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার। আগুনের একপর্যায়ে বাঁশ-কাঠের রিসোর্টটি ভস্মীভূত হয়ে যায়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্টটির তিনটি তলাই কাঠের তৈরি ছিল। আগুনে পুরো স্থাপনাটি পুড়ে গেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের কাছে নিখোঁজ ছয়জনের নাম আছে। তারা হলেন-ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫)।
জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এখন পর্যন্ত নিখোঁজের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিসোর্টে অবস্থানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস এ বিষয়ে তদন্ত করছে। রিসোর্টের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন লাগার প্রকৃত কারণ বলা যাচ্ছে না।
তদন্ত কমিটি : অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ম্যানেজার গ্রেপ্তার : কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন/ জে এফ জয়

