১০২তম বর্ষে পদার্পণ করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নানা সংগ্রাম ও গৌরবময় কণ্টকাকীর্ণ ১০১ বছর পাড়ি দিয়ে আজকের এদিনে (১ জুলাই) ১০২তম বর্ষে পদার্পণ করল। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি ঝুলি অপ্রাপ্তি তুলনায় ঢের বেশি। যেখানে রয়েছে গৌরবগাঁথা ফেলে আসা নানা গল্প। জাতির ক্রান্তিলগ্নে সর্বদাই এ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একমাত্র নিশানা।

দেশ ভাগের পর ৪৮ থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র স্বাধীনতা সংগ্রাম, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি পরতে পরতে এই নাম জড়িয়ে আছে দেশের এ বিদ্যাপীঠ। পৃথিবীর হয়তো অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে, তবে তো একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি-রক্ষায় কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয় এক বিরল ইতিহাস স্থাপন করেছে।

বঙ্গভঙ্গ রদের অল্প কিছুদিন পরেই ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে। তারই অংশ হিসেবে ওই বছরের ২৭ মে নাথান কমিশন গঠিত হয়। ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কমিশন ইতিবাচক রিপোর্ট দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তবে এর পরই বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে সেই কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশন পুনরায় ইতিবাচক রিপোর্ট দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হয়। অবশেষে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯২০ পাস হয়। ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এই বিলে সম্মতি প্রদান করেন। এর ফলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠাকালীন তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল ৬০ জন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৮৪টি বিভাগ, ৬০টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র এবং ছাত্রছাত্রীদের ১৯টি আবাসিক হল, ৪টি হোস্টেল ও ১৩৮টি উপাদানকল্প কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার ১৫০ জন। পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৮ শিক্ষক।

বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র গঠন কিংবা স্বার্থ আদায়ে সংগ্রামের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট গর্ব করার মত হলেও। বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাল মিলিয়ে চলতে অনেকাংশেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গবেষণা শিক্ষকদের অনীহা, গবেষণাতে চৌর্যবৃত্তি, রাজনীতির নামে শিক্ষকদের মাঝে নোংরা সংস্কৃতি, নোংরা লেজুড়বৃত্তি ছাত্র রাজনীতিসহ নানা অভিযোগ হরহামেশাই গণমাধ্যমে উঠে আসে।

শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের প্রত্যাশা হয়ত লড়াই-সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাবে। হয়তো বিশ্বের অন্যতম প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এবছর গবেষণা-উদ্ভাবনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ জোর দেবে। যা দেশের এ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, প্রিয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ মহামারিসহ বৈশ্বিক নানামুখী অভিঘাত মোকাবিলা করে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। যুগ ও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, নতুন নতুন উদ্ভাবন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, মুক্তচিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ, সৃজনশীলতার চর্চা এবং নতুন ও মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে। কারিকুলাম ও পাঠক্রমের আধুনিকায়ন এবং মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

‘এর অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ‘গবেষণা-প্রকাশনা মেলা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের যোগসূত্র স্থাপিত হবে বলে আশা করছি। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং বিশ্বমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে আমি শিক্ষক, গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সদয় সহযোগিতা ও সমর্থন প্রত্যাশা করি। প্রকৃতি ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে অবারিত জ্ঞান চর্চা এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত হবে- এ আমার বিশ্বাস। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই’।

এদিকে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সকাল ১০টায় শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের খেলার মাঠে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১০টার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রা সহকারে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের খেলার মাঠে সমবেত হবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোর পতাকা উত্তোলন, পায়রা উড়ানো, কেক কাটা এবং সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে থিম সং পরিবেশিত হবে।

সকাল ১১টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘গবেষণা ও উদ্ভাবন : ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.