সরকারের ৯ বছরের কর্মকাণ্ড জানতে চাই : ড.কামাল

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
২০১০ সালে সংঘটিত নিমতলী ট্র্যাজেডি থেকে ২০১৯ সালে চকবাজার ট্রাজেডি পর্যন্ত হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী করেছে, তা জানতে চেয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে গণফোরাম আয়োজিত এক শোক সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘সরকার একটু ভাব নিয়ে আছেন। তারা ভাব করেন যেন তারা দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। আমি আজকে আক্রমণ করে না বলি— আমরা তথ্য চাই, জনগণ তথ্য চায়, এই ৯ বছরে কী হয়েছে এই ব্যাপারে। এই যে আদেশগুলো দেওয়া হয়েছিল, কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আমার জানার আগ্রহ আছে। কেন আপনারা জানাবেন না। দেশ তো কারও পৈত্রিক সম্পত্তি না। দেশের মালিক জনগণ। এটা আমার কথা না, দেশের সংবিধানে এক নম্বরে যে স্বাক্ষর রেখেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, তিনি লিখে গিয়েছেন। এ দেশের জনগণ ক্ষমতার মালিক। আপনারা তথ্য দেন, তথ্য না দিলে কিভাবে মালিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের সেবক হওয়ার কথা, তারা তথ্য দেয় না। তথ্য না দিলে কিভাবে মালিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আপনারা (জনগণ)। আমি জানতে চাই ৯ বছরে কেন হলো না, আপনারা জানতে চান কিনা? এটা না জানানো মহাঅন্যায় কিনা? কিন্তু কথা হলো এই ৯ বছরে কী করেছেন?’
ড. কামাল বলেন, ‘আজকে এই আদেশ হাইকোর্ট আবারও দিয়েছে। যেখানে জনগণের মালিকানায় রাষ্ট্র পরিচালনা হয়, সেখানে দায়িত্বহীনতা একদমই থাকার কথা না। দায়িত্ববোধ থাকার কথা। মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি, জানমালের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা যায়, এটাই তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব কর্তব্য, সরকারের দায়িত্ব কর্তব্য।’
গণফোরাম সভাপতি আরও বলেন, ‘এই দেশ হলো ১৬ কোটি, ১৭ কোটি মানুষের দেশ। এখানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দায়িত্ববোধের প্রয়োজন আছে, নৈতিকতার প্রয়োজন আছে, দেশের মানুষের প্রতি দরদের প্রয়োজন আছে। ৯ বছর আগে নিমতলীতে এই ধরনের ঘটনায় ১২৪ জন সেখানে নিহত হয়েছেন, এটা নিয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। তখনও হাইকোর্ট থেকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, তার জন্য পদক্ষেপগুলো নেওয়া হোক।’
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘৯ বছর আগে সরকারকে আদেশ দেওয়া হয়েছে এই ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, এর জন্য সবাইকে নিয়ে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কোনও অগ্নিকাণ্ডে আর যেন এ ধরনের ধ্বংস না হয়। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে আমরা এ ধরনের কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল­াহ চৌধুরী বলেন, ‘চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কোনও কারণ আছে, নাকি এর পেছনে কোনও কথা আছে? এটা কি সিলিন্ডার ফেটে ধরেছে, নাকি সিগারেটের আগুনে ধরেছে। নাকি কোনও বিদেশি চক্রান্ত আছে? এটা আবার আমাদের অগ্রগতি রোধ করার জন্য কোনও প্রচেষ্টা নয়তো? এত বড় ঘটনায় যারা মারা গেলেন, তাদের জীবনের দামমাত্র ৫০ হাজার টাকা। এই হলো আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ।’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অতি শিগগিরিই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যাজিশিয়ান হতে যাচ্ছেন মন্তব্য করে জাফরউল­াহ বলেন, ‘২৯ ডিসেম্বর রাতে আমরা যখন সবাই আল­াহ বিল­াহ করছি, তখন তিনি তার আমলাদের দিয়ে যে ম্যাজিক দেখালেন, পরের দিন আমরা তা দেখতে পেলাম। ওনার ম্যাজিক দেখে অনেকগুলো রাষ্ট্রের প্রধান বাহাবা জানিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘স¤প্রতি ২১ বছরের যুবক নাকি বিমান ছিনতাই করতে গিয়েছিল। তার কাছে খেলনা পিস্তল ছিলে। সে জন্যে কমান্ডো নামানো হয়েছে। আজকের পত্রিকা দেখলে দেখতে পাবেন, তার কাছে নাকি কোনেও কিছুই ছিল না। সবচেয়ে বড় বাহাদুরি হলো কি জানেন, একজন যুবক তার কাছে পিস্তল নাই তাকে জীবিত ধরতে পারলেন না। অদ্ভুত আমাদের কার্যক্রম ব্যবস্থা। এখন সেই যুবক কি ভারসাম্যহীন ছিল, নাকি অন্য কিছু তার প্রমাণ নাই। আসলে আমাদের সরকারও তো ভারসাম্য হারিয়েছে।’
নাগরিক ঐক্যের আহŸায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘চকবাজারের এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যায়া মারা গেছেন, আমার বক্তব্যের শুরুতে তাদের প্রতি জানাই শোক। কতজন মারা গেছেন মোট বলেন তো, প্রথমে ৭১ জন, পত্রপত্রিকা ঘটনার পর বলছে ৭৬ জন, প্রথম আলো লিখেছে মৃত্যু নিয়ে সংশয়। কারণ, নিউইয়র্ক টাইম লিখেছে ১১০ জন। এখনও আমি-আপনি কী জানি আরও কতজন লোক মাটির নিচে মরে পড়ে আছে কিনা? সব লাশের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে বলছে, সরকার প্রকৃত লাশের হিসাব জানতে দিচ্ছে না। একটা প্রকৃত ডাকাতদের কবলে আমরা। এই দেশ এখন ডাকাতরা দখল করেছে। গ্রামে ডাকাত পড়লে তারা বন্দুক নিয়ে আসে, কোথাও স্টেনগান নিয়ে আসে। কিন্তু এ ডাকাতরা রাষ্ট্রের সব থেকে বড় ফায়ার পাওয়ার নিয়ে ভোট ডাকাতি করেছে।’
মন্ত্রীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বক্তারা দুই শিল্পমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন, কিন্তু বর্তমান শিল্পমন্ত্রী কী করেছেন? এ দুর্ঘটনার কারণ কী? শিল্পমন্ত্রী ঘটনার দিন বলেছেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এরপর আমি আর সিলিন্ডার মন্ত্রীকে দেখছি না। এব্যাপারে তিনি আর কোনও কথা বলছেন না। কারণ, তার কথার কোনও সত্যতা মিলছে না। একথা তিনি বলছেন, কারণ ব্যবসায়ীরা তা বলেছে।’
১০ বছরে কোনও কাজ হয়নি উলে­খ করে মান্না বলেন, ‘দুই দিন আগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হাসপাতালে গিয়ে বললেন একটা কোনও ঘটনা ঘটলেই সাংবাদিকরা কথা বলে, এত কিসের কথা, আগে কাজ করতে দিন। ১০ বছর আপনাদেরকে কাজ করতে দেওয়া হয়ছিল, আপনারা কোনও কাজ করতে পারেননি। এখন কিভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে এর কারণ সাংবাদিক জানবে না?’
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে বিমান হাইজ্যাক, এটা কী কোনও হাইজ্যাকের ঘটনা? একটা লোক একা কিভাবে বিমান হাইজ্যাক করে? সেই খেলনা পিস্তল আর পাওয়া যাচ্ছে না। এই কমান্ডোরা নিরস্ত্র একজন ব্যক্তিকে ধরতে পারলো না। তাকে হত্যা করলো। ঘটনা কী? এঘটনা চাপা রাখতে পারবে না।’
খালেজা জিয়ার কথা উলে­খ করে মান্না বলেন, ‘আপনি যদি মানুষকে অন্যায়ভাবে সাজা দেন, তাহলে জনগণ বসে থাকবে না। আমরা আজ এই শোক সভায় শুধু কাঁদতে আসিনি, কান্নাকে বারুদে পরিণত করতে এসেছি। এই সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এসেছি।’
শোকসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.মঈন খান, আ স ম আব্দুর রব, গণফোমারমের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সভাপতি সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.