লন্ডনে প্রথা ভেঙে বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট দেয় ব্রিটিশ পুলিশ : ড. কামাল

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বজুড়ে কেমন সম্মানের জায়গায় আসীন হয়েছিলেন, তা বোঝাতে পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পথে লন্ডন বিমানবন্দরে এক ব্রিটিশ পুলিশের তাকে স্যালুট দেওয়ার কথা তুলে ধরলেন কামাল হোসেন।

বঙ্গন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে শুক্রবার সকালে এক আলোচনা সভায় কামাল হোসেন বলেন, আমরা যখন (মুক্তি পেয়ে পাকিস্তান থেকে) লন্ডনে এয়ারপোর্টে নামলাম তখনকার একটা স্মৃতি আমার খুব স্মরণীয়। আমরা যখন ঢুকছি, ব্রিটিশ পুলিশ একদম স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে আমরা ঢুকব, এক পা বাড়িয়ে স্যালুট দিয়ে তার চোখ দিয়ে প্রায় পানি পড়ছে, বলছে যে, ‘স্যার উই হ্যাভ বিন প্রেয়িং ফর ইউ’ (আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছিলাম)।

তখন বুঝেছিলাম বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাধারণ মানুষরা কীভাবে আমাদের স্বাধীনতার প্রতি সহানুভুতিশীল ছিল এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি কী শ্রদ্ধা তাদের ছিল। বিশ্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমরা যে সমর্থন পেয়েছিলাম তা দেখেছি আমরা যখন প্রথম জাতিসংঘে গেলাম, সবাই বলছে, এই সেই শেখ মুজিব, সবাই শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তাকে- যা ভাষায় বলা যায় না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। এরমধ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান শেখ মুজিবুর রহমান।

নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। এর ২৪ দিন পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পর লন্ডন হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। ওই ফ্লাইটে ছিলেন কামাল হোসেনও। তবে মুক্তিযুদ্ধকালে এই আইনজীবীর পাকিস্তানে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকের।

পাকিস্তান থেকে লন্ডনে যাত্রা করার স্মৃতিচারণ করে কামাল হোসেন বলেন, পাকিস্তান থেকে লন্ডনে যখন আমরা গেলাম, ১০ জানুয়ারির একটা স্মৃতি। আধা ঘণ্টা আগে তারা বলল যে, একটা মেসেজ প্লেন থেকে বলবেন যে, প্লেন আসছে লন্ডনে নামতে চায়। এর মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন। নামও তোমরা বলবে না। এই মেসেজটা আমার কাছে দেয়া হল যে, ওরা জানতে চাচ্ছে আসলে কি শেখ মুজিবুর রহমান আছেন নাকি প্লেনে এবং আমি বললাম যে, হ্যাঁ উনি আছেন।

তখন তারা (যুক্তরাজ্য সরকার) বলল যে, এটা কনফার্ম করাতে উনাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আমরা সন্মানের সঙ্গে সংবর্ধনা দেব এবং আমরা রওনা দিচ্ছি এয়ারপোর্টের দিকে। বন্দিদশায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগতভাবে বঙ্গবন্ধুর ওপর চাপ প্রয়োগ করে গেলেও তিনি নতি স্বীকার করেননি বলে জানান কামাল হোসেন।

তিনি বলেন, উনি (বঙ্গবন্ধু) অনড় ছিলেন। উনার কাছ থেকে তারা (পাকিস্তানিরা) কোনো কিছু নিতে পারেনি। উনি বার বার বলেছেন যে, আমরা স্বাধীন হয়েছি এটাকে স্বীকৃতি দাও। তারা বলছে, কথা-বার্তা বলেন। উনি বলেছেন, এখানে বসে তো কোনো কথা-বার্তা হতেই পারে না।

বাংলাদেশে আমি যাই, ওখানে আসো, ওখানে কথা-বার্তা যা হয় হবে। তবে একটা বলে দেই, প্রথম কথা এটা স্বীকার কর- বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। এটা মেনে নিয়ে আস কথা-বার্তা হবে, সম্পর্ক ইত্যাদি। আর এটা বললেন যে, আমরা তোমার দেশের মানুষের মঙ্গল চাই। এসব ব্যাপারে উনি (বঙ্গবন্ধু) খুব অনড় ছিলেন। চাপ রেখেছিল কিন্তু উনি অনড় ছিলেন।

কামাল হোসেন বলেন, উনি বললেন, আমাকে দ্রæত বাংলাদেশে নেওয়ার ব্যবস্থা কর। ওরা বলল যে, আমরা তো পাকিস্তানের প্লেনে ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে ফ্লাই করতে পারি না। বললেন, অন্য দেশের প্লেন নাও, আমরা যে কোনো দেশকে বলব, জাতিসংঘকে বলব, প্লেনের ব্যবস্থা করা কোনো ব্যাপারই না। তখন উনি বললেন, আমরা লন্ডন হয়ে যাব। তখন সেই ব্যবস্থা করা হল।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা কামাল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু অসাধারণ একজন, তার সেই নেতৃত্বের ফলে স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল, আজকে আমাদের ৪৯ বছর হতে চলেছে। আমি আজকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উনার কথা স্মরণ করি, উনার কীর্তির কথা স্মরণ করি। বাংলাদেশ যতদিন আছে, উনাকে সেভাবে মানুষ শ্রদ্ধা করবে। যে অনুপ্রেরণা উনি দিয়ে গেছেন, অন্যায়ের সাথে কোনো আপস করা যায় না, অন্যায় অন্যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ করতে হবে।

উনি বলেছেন, অন্যায়ের ব্যাপারে কোনো আপস করা যাবে না। সেটা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে। সেই জিনিসটা কোনো জায়গা যদি অন্যায় হচ্ছে, সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে। উনার স্বপ্নের যে রাষ্ট্র ৭২ সালে সংবিধানে লিখে গেছেন। এটা জাদুঘরে সংরিক্ষত আছে। এক নম্বরে লেখা আছে- এদেশের মালিক জনগণ।

জনগণ মালিক হলে এখানে যে কোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা কামাল হোসেন। যারা এই অন্যায়-অপরাধ করছে তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে যে, এরা অসাংবিধানিক কাজ করছে, এটা বঙ্গবন্ধু যে আদর্শ ছিল সেটা অমান্য করছে। অর্থাৎ সেই জিনিসটা আমি মনে করি, আমাদের বড় সম্পদ যেটা উনি সংবিধানে স্বাক্ষর করে দিয়ে গেছেন জাদুঘরে সেটা সংরক্ষিত আছে।

স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জাদুঘরে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দলিল দেখানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কামাল হোসেন বলেন, উনাকে (বঙ্গবন্ধু) শ্রদ্ধা করতে হলে উনার সেই লেখাটাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। উনি যে আমাদের মালিক করেছেন, মালিকানা ছাড়তে পারি না। দেশের মালিক জনগণকে থাকতে হবে- এটি হলো স্বাধীনতার অর্থ। স্বাধীনতা মানে দেশের মালিক জনগণ, কোনো ব্যক্তির না, কোনো স্বৈরতন্ত্র থাকার অবকাশ নেই। গণতন্ত্র থাকবে, নির্ভেজাল গণতন্ত্র, সকল জনগণ সেখানে মালিকের অবস্থানে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে গণফোরাম সভাপতি বলেন, জনগণ ক্ষমতার মালিক-দেখেন চারিদিকে। যদি কোনো ঘাটতি এর মধ্যে থাকে তাহলে বঙ্গবন্ধুর কথাকে অমান্য করা হচ্ছে। সংসদ আসলে সার্বভৌম সংসদ হিসেবে কাজ করতে পারছে কি পারছে না, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হচ্ছে কি হচ্ছে না- এর কোনোটার মধ্যে যদি কোনো রকমের ঘাটতি হয় ধরে নিতে হবে যে, বঙ্গবন্ধুর কথাকে অমান্য করা হচ্ছে।

জাতির পিতাকে সবার ঊর্ধ্বে রেখে শ্রদ্ধা জানানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সেই শ্রদ্ধা নিয়ে উনি যে কথাগুলো দিয়ে গেছেন সেটাকে অমান্য করা- এটা যে কত বড় উনার প্রতি অশ্রদ্ধা আমাদেরকে বুঝতে হবে। সকলকে এককভাবে বা যৌথভাবে সেটাকে রক্ষা করার জন্য যে কোনো ঝুঁকি নিয়ে রক্ষা করতে হবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে গণফোরামের উদ্যোগে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস-২০২০’ উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়। সভায় গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বিার খান, মহসিন রশিদ, জগলুল হায়দার আফ্রিক, মোশতাক আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

 

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.