মেক্সিকো সীমান্তে বাবা-মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

 

 

 

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

মেক্সিকোর রিও গ্রান্ড নদীর তীরে কাদাপানির মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন এক বাবা, তার পিঠে ছোট্ট একটি মেয়ে। মেয়েটির মাথা বাবার টি-শার্টের ভেতর ঢোকানো, ছোট্ট হাত দিয়ে সে বাবার গলা জড়িয়ে আছে। বাবা-মেয়ে এভাবে ঘুমিয়ে নয়, মরে পড়ে আছে।

সোমবার তোলা হয়েছে মর্মান্তিক এ ছবি। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে ছবিটি। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এ ছবি দিয়ে মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর তাতেই ফুটে উঠেছে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করা মানুষদের দুর্ভোগের নেপথ্য কাহিনী।

এল সালভাদর থেকে আসা অস্কার অ্যালবার্তো মার্টিনেজ রামিরেজ তার পরিবার নিয়ে রিও গ্রান্ড নদী  পাড়ি দিয়ে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময়ই ২৩ মাস বয়সের মেয়ে ভ্যালেরিয়াকে নিয়ে তীব্র স্রোতে মাঝনদীতে ভেসে গিয়ে মারা যান অস্কার। পরে নদীর কিনারায় এসে ভীড়ে তাদের লাশ।

সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটিই ক্যামেরায় ধারণ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক জুলিয়া ল্য ডুউক। মেক্সিকোর স্থানীয় লা জর্নাডা পত্রিকায় ছবিটি প্রকাশ করেন তিনি। পত্রিকাটি অস্কারের স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি জানান, পুরো ঘটনাটি তার চোখের সামনেই ঘটেছে। স্বামী ও মেয়ের ডুবে যাওয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।

মানুষ জীবনের কতটা ঝুঁকি নিয়ে মারাত্মক বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করছে বাবা-মেয়ের মৃত্যুর ওই ছবিই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। অথচ সীমান্ত নীতি নিয়ে উচ্চস্বরে বিতর্ক এবং চেঁচামেচির আওয়াজে তাদের দুঃখজনক এ পরিণতি অদেখাই থেকে যায়।

শুধু মাঝে মধ্যে এরকম কিছু ছবি আলোড়ন তোলে এবং বিশ্ববাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং শরণার্থী ও অভিবাসন প্রার্থীদের তীব্র দুর্দশার চিত্র দেখায়।

ডুবে মরা বাবা-মেয়ের এ ছবি প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমক্র্যাটরা সীমান্তে ভিড় করা অভিবাসন প্রত্যাশীদের অবস্থার উন্নয়নে সাড়ে চারশ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি মানবিক ত্রাণ সহায়তা বিল অনুমোদন করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমক্র্যাটিক নেতা জোয়াকিন ক্যাস্ত্রো ওয়াশিংটনে ছবিটি নিয়ে কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ ছবি আইনপ্রণেতদের মধ্যে এবং আমেরিকার বৃহৎ জনসাধারণের মনে পার্থক্য গড়ে দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বলেন, এই ছবি দেখা খুব কঠিন। এ ছবি যেন সিরিয়ায় সৈকতে ভেসে আসা তিন বছরের বালকের মৃতদেহ আমেরিকান সংস্করণ। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ জানায়, ২৫ বছরের তরুণ অস্কার অ্যালবার্তো মার্টিনেজ তার স্ত্রী তানিয়া ভানেসা ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এল সালভাদোরে বসবাস করতেন।

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন করতে গত সপ্তাহে তারা মেক্সিকোর সীমান্ত নগরী মাতামরোসে আসেন। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, আন্তর্জাতিক সেতুটি সোমবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এরপর তারা নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকেন এবং সাঁতরে নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

গত রোববার দুপুরের পর পরিবারটি নদীতে নামে। সঙ্গে তাদের একজন পরিবারিক বন্ধু ছিলেন, যিনি তানিয়াকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মার্টিনেজ মেয়েকে নিজের টি-শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেতে থাকেন বলে জানান তার স্ত্রী।

কিন্তু নদীতে গ্রোতের কারণে তানিয়া আর এগুতে সাহস না পেয়ে ফিরে যান। মেক্সিকো প্রান্তে নদীর পাড়ে ফিরে তিনি দেখেন তার স্বামী মেয়েকে পিঠে নিয়ে  আমেরিকার প্রান্তে নদীর পাড়ে পৌঁছানোর লড়াই করছেন।

তানিয়া বলেন, তীব্র স্রোতে মার্টিনেজ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি নদীর পাড়ে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিলেন। কিন্তু পাড়ে পৌঁছানোর আগেই তারা ডুবে যায়।

সোমবার মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ অবরাডর। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, লোকজন যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাতে গিয়ে মরুভূমিতে এবং রিও গ্রান্ড নদীতে ডুবে মরছে।

 

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *