মন ভালো নেই বিএনপি জোটের শরিকদের

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
বিএনপি নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মন ভালো নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নানা বঞ্চনার দায়ভার বিএনপির ওপরে দিচ্ছে শরিকরা। পুরোনো ভুলভ্রান্তি শুধরে জোটকে নিয়ে নতুন আঙ্গিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ শরিক দল। তবে অধিকাংশই এই সরকারের অধীনে আর কোনও নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে। জোটের ২৩টি শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে।
এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘আপাতত কোনও এজেন্ডা না থাকায় জোটের কোনও বৈঠক হচ্ছে না। এখন জোটের প্রধান কাজ হবে মাঠপর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করা। কারণ তৃণমূলের সংগঠনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।’
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না মন্তব্য করে সেলিম বলেন, ‘এই সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কেমন নির্বাচন হয় তা ইতোমধ্যে পুরো বিশ্ববাসী দেখেছে। তাই আমি মনে করি, উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না।’
খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘জোটের ভবিষ্যত কী হবে তা এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। জোটের আবার মিটিং হলে তখন বলা যাবে। তাছাড়া দেশে তো একনায়কতন্ত্র চলছে, কোনও কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না। আর উপজেলা নির্বাচন নিয়ে এখনও জোটগত বা দলগত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’
জোটের অনেক নেতা অনেকটা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিএনপি সারাক্ষণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে মেতে আছে। অথচ ঐক্যফ্রন্টের আহŸায়ক ড. কামাল হোসেন নতুন করে আবারও জামায়াত ইস্যু আলোচনা এনে বিএনপিকে যেমন চাপে ফেলেছে, তেমনি সরকারকেও একটি আলোচনার খোরাক তুলে দিয়েছে।’
ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, ২০ দলীয় জোট আর বিএনপির রাজনীতি একই ধারার। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতির কোনও মিল নেই। কারণ, আমরা জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতি করি। আর ঐক্যফ্রন্ট শেখ মজিবুর রহমানকে তাদের আদর্শ মনে করেন। এখন বিএনপি কাকে পাধান্য দেবে তাদের তা ঠিক করতে হবে।’
পিপলস লীগের চেয়ারম্যান গরীব নেওয়াজ বলেন, ‘এখন জোটের প্রতি বিএনপির মনোযোগ কিছুটা কম বলে মনে হচ্ছে। তবে আমি মনে করি, সংগঠন গুচিয়ে বিএনপিকে মাঠের কর্মসূচিতে ফিরতে হবে। আর শুধু উপজেলা নির্বাচন নয়, এই সরকারের অধীনে আর কোনও নির্বাচনেই যাওয়া ঠিক হবে না।’
জোটের নেতারা বলছেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে হয়তো ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে জোটের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মাঠের কর্মসূচিতে ফিরবে বিএনপি।’
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘কিছুদিন আগে তো নির্বাচন হয়েছে। আশা করি, এবার মাঠের কর্মসূচিতে যাবে জোট।’
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাঈদ আহমদ বলেন, ‘আমি মনে করি, বিএনপি জোটের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকা উচিত। কারণ, বল প্রয়োগ করা ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়। আর এই সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না।’
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘জোটের তো কোনও কর্যক্রম নেই। আমার ধারণা, হয়তো আগামী সপ্তাহে মিটিং করে এই বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
বিএনপির প্রতি শরিকদের অবহেলার অভিযোগ থাকলেও জোট ছাড়ার বিপক্ষে তারা। জোটের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার হাত ধরে এই জোট গঠিত হয়েছে। এখন খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তারা জোট ছাড়বে না। তবে কেউ কেউ জোটে থাকা নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব আছেন।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ইব্রাহীম বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটে আছি, সামনেও থাকবো। দেখা যাক সামনে কী হয়।’
বাংলাদেশ ইসলামি পার্টির চেয়ারম্যান আবু তাহের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা জোটে থাকা- না থাকা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। জোটে থাকার বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের।’
জোটের নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর থেকে বিএনপির সব মনোযোগ ও কার্যক্রম তাদেরকে ঘিরে। কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের থেকে। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনও আলাপ-আলোচনা করা হয় না। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের একদিন পরে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। এরপর জোটের কোনও বৈঠক বা কোনও কর্মসূচি ছিল না। অথচ বিএনপির নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগর দুটি জেলা সফরেও গিয়েছেন। এই সফরগুলোতে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের ডাকা হয়নি।’
উলে­খ্য, নির্বাচনের দিন (৩০ ডিসেম্বর) রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীকে দেখতে গত ৫ জানুয়ারি সেখানে গিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। এই সফরে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে গিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব। এরপর গত ১৪ জানুয়ারি সিলেট সফরে যান মির্জা ফখরুল, ডা. জাফরুল­াহ চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ।
জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘আমার সঙ্গে বিএনপির তেমন কোনও যোগাযোগ নেই। জোটের কোনও কর্মসূচি নেই।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘২০ দলীয় জোট নিয়ে বিএনপির কোনও চিন্তা-ভাবনা নেই। তাদের মনোভাব এখন এমন যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই সবকিছু। জোট না থাকলেও চলবে। জোটের কোনও কর্মসূচি না থাকলেও বিএনপি তো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে বিভিন্ন জেলা সফরে যাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের নিয়ে মিডিয়াতেও আসছে।’
মুসলিম লীগের সভাপতি কামরুজ্জামান খান বলেন, ‘আমরা ২০ দলীয় জোটে আছি এবং থাকবো। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর থেকে ২০ দলীয় জোটকে বিএনপি একটু কম সময় দিচ্ছে। আন্দোলন ও নির্বাচন বিষয়ে জোটের সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত।’
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে আসন না পেয়ে মনক্ষুণœ অনেক শরিক দল। তারা বলছে, ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের খুশি করতে গিয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের বঞ্চিত করেছে বিএনপি।
জাগপার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসনিয়া প্রধান বলেন, ‘নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে কেনও দেওয়া হয়নি, তা বলতে পারবো না। এ কারণে আমি আমাদের দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছি।’ তিনি আর বলেন, ‘আমরা এখন ২০ দলীয় জোট নিয়ে কোনও চিন্তা করছি না। নিজেদের দল গোছানো নিয়ে ব্যস্ত আছি। ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে না গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা দলগতভাবে অংশ নেবো।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করেছিল বিএনপি। পরে এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে যুক্ত হয় নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। পরবর্তিতে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নতুন ১২টি দলে সংযুক্তির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দলীয় জোটে। এরপর জোটের পরিধি দাঁড়ায় ২০ দলে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপির একাংশ জোট ছেড়ে যায়।
বর্তমানে ২০ দলীয় জোটে ২৩টি দল রয়েছে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী ঐক্যজোট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এনডিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ভাসানী, ডেমোক্রেটিক লীগ, পিপলস লীগ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ, জাতীয় দল ও মাইনোরেটি পার্টি।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.