ভালবাসার ভিন্ন রকম কিছু সংস্কৃতি

বিশ্বজুড়ে আজকের দিনে পালিত হচ্ছে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালবাসা দিবস। প্রিয়জনকে ভালবাসা প্রকাশের নানা রীতি রয়েছে বিভিন্ন দেশে। কোথাও কোথাও উৎসবের আমেজে উদযাপন করা হয় দিন টি। ভালবাসার মানুষকে ফুল, কার্ড আর চকলেট দেয়ার রীতি রয়েছে অনেক স্থানে। কিছু কিছু দেশে প্রচলিত সংস্কৃতি বেশ চমকপ্রদ। ভিন্ন ধাচের। অনেক দেশে ভিন্ন দিনে পালন করা হয় ভালোবাসা দিবস। অনেক রীতি হারিয়ে গেছে কালের বিবর্তনে। চলুন দেখে নেয়া যাক, বিশ্বের ৭ টি দেশে কিভাবে ভালবাসা দিবস পালন করা হয় বা হতো।

১. ডেনমার্ক: ইউরোপের এ দেশটিতে ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন শুরু হয়েছে বেশি দিন হয় নি। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৯০ এর দশকের শুরু হয়েছে এ রীতি। তবে দেশটি ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে আপন করে নিয়েছে নিজেদের সংস্কৃতির মিশেলে। গোলাপের পরিবর্তে বন্ধু, স্বজন, প্রিয়জনরা আদান প্রদান করেন স্নো-ড্রপস নামের সাদা রংয়ের একটি ফুল। ড্যানিশ ভ্যালেন্টাইনস ডে সংস্কৃতির আরেকটি জনপ্রিয় চর্চা হলো ‘লাভার্স কার্ড’ আদান প্রদান। শুরুর দিকে কার্ডগুলো ছিল স্বচ্ছ। যিনি কার্ডটি দিচ্ছেন তার একটি ছবি থাকতো। এখন অবশ্য ভালবাসা দিবসে দেয়া যে কোন কার্ডকেই ‘লাভার্স কার্ড’ বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও ১৪ই ফেব্রুয়ারি পুরুষরা নারীদের ‘গায়েকেব্রেভ’ বা ‘জোকিং লেটার’ দেয়। এই চিঠির বিশেষত্ব হলো, দারুণ নকশা করে কাটা কাগজে লেখা হয় মজার একটি কবিতা। কবিতার শেষে নামের বদলে দেয়া হয় কয়েকটি বিন্দু। চিঠি পাওয়া নারী যদি প্রেরকের নাম সঠিক বলতে পারেন তাহলে বছরের শেষে তিনি অর্জন করেন একটি ‘ইস্টার এগ’ (বসন্ত বা ইস্টার উদযাপনে ব্যবহার হওয়া নকশা করা ডিম)।

২. দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালবাসার যুগলদের কাছে এ দিনটি অনেক জনপ্রিয়। ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত নানা আয়োজনে চলে উদযাপন। উপহার দেয়া শুরু হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এদিন নারীরা তাদের পছন্দের পুরুষদের চকলেট উপহার দেন। মার্চ মাসের ১৪ তারিখ নারীদের উপহার দেয়ার পালা থাকে পুরুষদের। হোয়াইট ডে বলে পরিচিত এ দিনে পুরুষেরা তাদের প্রিয়তমাদের চকলেট, ফুলসহ আরও একটি উপহার দিয়ে থাকেন। আর যাদের সঙ্গি বা সঙ্গিনী নেই। অর্থাৎ যারা ভ্যালেন্টাইনস ডে বা হোয়াইট ডে পালন করতে পারছেন না, তারা ১৪ই এপ্রিল পালন করেন ‘ব্ল্যাক ডে’। এদিন, নিঃসঙ্গ নারী পুরুষরা ‘জাজাংমিয়ন’ নামের একটি নুডলস খেয়ে নিঃসঙ্গতা পালন করেন।

৩. ওয়েলস: এখানে অবশ্য ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবস পালন করা হয় না। তারা সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের পরিবর্তে সেইন্ট ডুইনওয়েনকে উদযাপন করেন ২৫শে জানুয়ারি। তাদের উদযাপন রীতি বেশ মজার। ভালবাসা প্রকাশে তাদের ঐতিহ্যবাহী একটি উপহার হলো চামচ। এটাকে বলা হয় ‘লাভ স্পুন’ বা ভালবাসার চামচ। ১৭ শতাব্দীতে ওয়েলসের পুরুষরা তাদের ভালবাসার নারীদের জন্য কাঠের চামচ তৈরি করতেন। এতে নানা নকশা করা থাকতো। আর প্রতিটি নকশায় লুকিয়ে থাকতো অন্তর্নিহিত অর্থ। যেমন, গাড়ির চাকার নকশা সমর্থন প্রকাশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। চাবি থাকলে এর অর্থ মনে করা হয় একজন পুরুষের হৃদয়ের চাবি। শুধু ভালবাসা দিবসেই নয় বিয়ে, বর্ষপূর্তি, জন্মদিনসহ নানা আয়োজনে আদান প্রদান কর হয় ‘লাভ স্পুন’।

৪. চীন:  চীনে ভ্যালেন্টাইনস ডে’র সমার্থক হলো কিশি বা ‘সপ্তম রাতের উৎসব’। প্রতি বছর সপ্তম চন্দ্র মাসের সপ্তম দিনে এ দিনটি পালিত হয়। চীনা লোকগাঁথা অনুযায়ী, স্বর্গীয় এক রাজার কন্যা ঝিনু দরিদ্র রাখাল নিউলাংয়ের প্রেমে পড়ে। তারা বিয়ে করে। আর তাদের জমজ সন্তান জন্ম নেয়। ঝিনুর পিতা তাদের বিয়ের খবর জানার পর তারার দেশে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে রানিকে পাঠায়। নিউলাং আর সন্তানদের হৃদয়বিদারক কান্না শোনার পর রাজা তার মেয়ে ঝিনুর সঙ্গে নিউলাংকে বছরে একদিন দেখার করার অনুমতি দেন। এ দিনটিই হলো কিশি। এদিন নারীরা ভালো একজন স্বামী পাওয়ার আশায় তরমুজ ও অন্যান্য ফল ফলাদি ঝিনুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। বিবাহিত দম্পতিরা সুখ সমৃদ্ধির জন্য উপসনালয়ে গিয়ে প্রার্থনা করেন। রাতের বেলায় মানুষ আকাশে উজ্জ্বল দুই তারকা ভেগা ও অলটেয়ারের কাছে আসা প্রত্যক্ষ করেন। চীনা লোকগাঁথায় ভেগাকে ঝিনু আর অলটেয়ারকে নিউলাং আখ্যা দেয়া হয়েছে।

৫. ইংল্যান্ড: ১৭ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডের নারীরা ভ্যালেন্টাইস ডে’তে মজার এক রীতি চর্চা করতেন। রাতে বালিশের চার কোনায় চারটি এবং মাঝখানে একটি করে তেজপাতা রাখতেন। এরপর প্রার্থনা করে তারা ঘুমুতে যেতেন। স্বপ্নে ভবিষ্যত স্বামীকে দেখতে পাওয়া ছিল এর উদ্দেশ্য। প্রার্থনাটা ছিল, ‘গুড ভ্যালেন্টাইন, বি কাইন্ড টু মি; ইন ড্রিমস লেট মি মাই ট্রু লাভ সি’। অনেকে আবার গোলাপজলে তেজপাতা রেখে সেগুলো বালিশের চারপাশে রেখে দিতেন।

৬. ফিলিপাইন্স: অন্যান্য দেশের মতো চিরাচরিত উদযাপন রীতি ফিলিপাইন্সেরও রয়েছে। তবে দেশটিতে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নতুন একটি সংস্কৃতি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটা হলো ১৪ই ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার যুগলের গণবিয়ে। এটা এতো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, প্রতিবছরই বিভিন্ন মল ও পাবলিক প্লেসে আয়োজিত গণবিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেয় শ’ শ’ যুগল।

৭. ইতালি: ইতালিয়ানরা ভ্যালেন্টাইস ডে উদযাপন করতো বসন্তের উৎসব হিসেবে। এদিন যুবক যুবতীরা বাড়ির বাইরে বাগানে সময় কাটাতো। উপভোগ করতো কবিতা আবৃত্তি আর গান। সঙ্গি সঙ্গিনির হাত ধরে হেটে বেড়াতো কিছুক্ষণ। ভ্যালেন্টাইনস ডে আরেকটি সংস্কৃতির প্রচলন ছিল এক সময়Ñ অবিবাহিত মেয়েরা এদিন ভোরের আগে ঘুম থেকে উঠতো। উদ্দেশ্য থাকতো, ভবিষ্যত স্বামীকে খুঁজে পাওয়া। বিশ্বাসটা এমন ছিল যে, ওই দিন একজন নারী প্রথম যে পুরুষকে দেখবে এক বছরের মধ্যে তার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে। অথবা, ওই ব্যক্তিকেই তার বিয়ে করা উচিত বলে মনে করা হতো। এখন, ইতালিয়ানরা ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন করে থাকে উপহার বিনিময় করে এবং রোমান্টিক ডিনারে প্রিয়জনকে নিয়ে সময় কাটিয়ে। আর ইতালিতে অনেক জনপ্রিয় একটি ভ্যালেন্টাইন ডে উপহার হলো, চকলেট দিয়ে ঢাকা হেজেলনাট। এটা মোড়া থাকে চারটি ভিন্ন ভাষায় লেখা রোমান্টিক বার্তা প্রিন্ট করা কাগজ দিয়ে।

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *