ভারতে নির্বাচন: ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ভাঙচুর, সংঘর্ষ-সহিংসতা

 

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

ভারতে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর দিনই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ভাঙচুর, সংঘর্ষ, প্রার্থীর ওপর হামলা এবং সহিংসতায় প্রাণহানিসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। নানামুখী অভিযোগের মাঝেই চলেছে ভোটগ্রহণ। পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটায় চার ঘন্টাতেই নির্বাচন কমিশনে ৪৬২ টি অভিযোগ এসেছে বলে জানিয়েছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ২০টি রাজ্যের ৯১টি আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। রাজ্যগুলো হচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, জম্মু ও কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, মনিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ওডড়িশা, সিকিম, তেলেঙ্গানা, ত্রিপুরা, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং লক্ষদ্বীপ।

পশ্চিমবঙ্গে সকালে ভোট চলার মধ্যেই রাজ্যের দিনহাটায় একটি বুথে ঢুকে ইভিএম, ভিভিপ্যাট ভাঙচুরের ঘটনায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এ ঘটনায় বিজেপি-তৃণমূল একে অপরকে দোষারোপ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের দুটি কেন্দ্র কোচবিহার এবং অলিপুরদুয়ারেও ভোট চলছে। দুই আসনেই মূল লড়াই তৃণমূল এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে।

কোচবিহারের তুফানগঞ্জে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন বিজেপি কর্মীর গুরুতর জখম হওয়ার খবর পাওয়া গেছে৷ তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপি কার্যালয় ভেঙে দেয়ার অভিযোগও উঠেছে।

ওদিকে, কংগ্রেস কোচবিহারে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে ভোটে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছে । তৃণমূল নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ জানিয়েছেন, নিয়ম না মেনে বুথের মধ্যে ঢুকে পড়ছেন বিএসএফ জওয়ানরা। পাশাপাশি ইভিএম কারচুপির অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

তৃণমূল এবং বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘিরে উত্তপ্ত হয়েছে দিনহাটাও। তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে ভোটারদের মারধরের অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। তৃণমূল কর্মীদের হামলায় এক বিজেপি সমর্থক আহতও হয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশে রক্তক্ষয়: অন্যদিকে, প্রথম দফার ভোটেই রক্ত ঝরেছে অন্ধ্রপ্রদেশে। রাজ্যটির তাড়িপাত্রী কেন্দ্রে ওয়াইএসআর কংগ্রেস এবং তেলুগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক টিডিপি নেতা নিহত হয়েছেন।

সংঘর্ষের সময় বেধড়ক মারধর করা হয় নেতা চিন্তা ভাস্কর রেড্ডিকে। যার জেরেই মৃত্যুর হয় তার। ঘটনাটিকে ঘিরে উত্তাল অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন বুথে ইভিএম-এর গন্ডগোলের জন্য ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাধা পড়ে। যা নিয়ে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কলহ চরমে ওঠে।

ভোটকর্মীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে তুলকালাম করে ফেলেন এ প্রার্থী। ইভিএম তুলে আছাড় মারেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই ওই প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্ধ্র প্রদেশের গুন্টাকাল বিধানসভা কেন্দ্রের একটি বুথে এ ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে, ইলুরু শহরে ওয়াইএসআর কংগ্রেসের এক মণ্ডল পারিষদের উপর আক্রমণ অভিযোগ এসেছে টিডিপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। কুর্নুলেরও টিডিপি এবং ওয়াইএসআরসিপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ি হয়। সবমিলিয়ে এ রাজ্যে উত্তপ্ত পরিবেশেই চলছে ভোটগ্রহণ।

মহারাষ্ট্রে বোমা বিস্ফোরণ: মহারাষ্ট্রে গড়চিরৌলি বুথের কাছে আইইডি বিস্ফোরণ ঘটেছে। গোটা দেশের সঙ্গে এখানেও ভোট হচ্ছে। বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভোট বানচালের চেষ্টা করেছে মাওবাদীরা। গড়চিরৌলি জেলার এটাপলি­তে একটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে এ হামলা চালানো হয়। তবে এ হামলায় হতাহতের কোনও খবর পাওয়া যায়নি।

ছত্তিসগড়ে সংঘর্ষ: ছত্তিসগড়ের বস্তারেও ভোটের দিন সকালে মাওবাদী-সেনা সংঘর্ষ হয়েছে। চলেছে গোলাগুলি। নারায়ণপুরে আইটিবিপি জওয়ানদের একটি কনভয় ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সময় হামলা চালায় মাওবাদীরা। পাল্টা গুলি চালিয়ে মাওবাদীদের দলটিকে হঠিয়ে দেন জওয়ানরা।

উত্তরপ্রদেশে ভুয়া ভোটার ঠেকাতে গুলি: উত্তরপ্রদেশের কৈরানায় ভুয়া ভোটারদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালিয়েছে বিএসএফ। ২০-২৫ জন ভুয়া ভোটার ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। তাদের কারো কাছে পরিচয়পত্র ছিল না। তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করায় তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিএসএফ জওয়ানরা। কিছু ক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ফের শুরু হয় ভোটগ্রহণ।

‘নমো ফুডস’ বিতরণ নিয়ে অভিযোগ: উত্তরপ্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগরের একটি বুথে পুলিশকর্মীদের ‘নমো ফুডস’ লেখা জলখাবারের প্যাকেট বিলির অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, বিজেপি’র পক্ষ থেকেই ওই খাবারের প্যাকেট বিলি করা হয়েছে পুলিশ কর্মীদের। গেরুয়া রঙের প্যাকেটের গায়ে লেখা ছিল ‘নমো ফুডস’।

কমিশন এ ব্যাপারে রিপোর্ট তলব করলেও পুলিশ প্রশাসনের দাবি, এটি নেহাতই কাকতালীয়। যে দোকান থেকে খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে, তার নাম ‘নমো ফুডস’। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাম বা বিজেপি’র কোনও যোগ নেই।

ভোটচিত্র: ২০ রাজ্যের মধ্যে ছত্তিসগড়, অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, উত্তরাখণ্ড- এ ছয় রাজ্যের অনেকগুলো আসনেই বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ হয়েছে। এ রাজ্যগুলোতে মূল লড়াই বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে। উত্তরপ্রদেশের ৫টি আসনেও ভোট হয়েছে। সেখানে মূল লড়াই এসপি, বিএসপি এবং আরএলডির জোটের।

ওদিকে, পশ্চিমবঙ্গে যে ২টি আসনে ভোট হয়েছে, সেই কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারে মূল লড়াই তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপি’র। বিকাল ৩টা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারে ভোট পড়েছে ৭১.৪৪%, কোচবিহারে ৬৮.৪৪%।

এছাড়া, উত্তরাখণ্ডে ৪৬.৫৯%, মণিপুরে ৬৮.৯০% এবং লক্ষদ্বীপে ৬৮.৯০% ভোট পড়েছে। বিহার এবং মহারাষ্ট্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র সঙ্গে লড়াই করছে ইউপিএ। ঊড়িশায় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে মূল লড়াই বিজেপি’র।

অন্ধ্রপ্রদেশ এবং নাগাল্যান্ডের মত রাজ্যগুলোতে একদিনে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও উত্তর প্রদেশের মতো কয়েকটি রাজ্যে কয়েকটি ধাপে ভোট গ্রহণ চলবে।

ভারতজুড়ে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হবে ১৮ এপ্রিল। এরপর ২৩ এপ্রিল তৃতীয় দফা, ২৯ এপ্রিল চতুর্থ দফা, ৬ মে পঞ্চম, ১২ মে ষষ্ঠ দফা ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ মে তে শেষ হবে সাত দফার ভোটগ্রহণ।

২৩ মে ভোট গণনার পর ফল ঘোষণা করবে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। সরকার গঠনের জন্য ২৭২টি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে যে কোনা দলকে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.