বোঝা গেল, সবই ছিল রাজনৈতিক বক্তৃতা : রাজীবের খালা

 

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

“কী বলব! কিছু বলার ভাষা নাই। এই এক বছরে আমরা তো আসলে কোনো কিছুই পাই নাই। না ড্রাইভারের শাস্তি হইছে, না ক্ষতিপূরণ পাইছি। ঘটনার তদন্ত করতে বলেছিল, তদন্ত রিপোর্ট দিছে। এখন পর্যন্ত শুনানি হয় নাই।” চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন মতিঝিলের বাসিন্দা জাহানারা বেগম, যার বোনের ছেলে রাজীব হাসানের মৃত্যু এক বছর আগে পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

গতবছর ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের রেষারেষিতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের ডান হাত কনুইয়ের ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার মাথার সামনে-পেছনের হাড় ভেঙে যাওয়া ছাড়াও মস্তিষ্কেও আঘাত লাগে।

দুই বাসের চাপায় ঝুলতে থাকা রাজীবের হাতের সেই ছবি পুরো দেশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ এপ্রিল মৃত্যু হয় রাজীবের।

পটুয়াখালীর বাউফলের ছেলে রাজীব যখন তৃতীয় শ্রেণিতে, তখনই মারা যান তার মা। বাবাও চলে যান রাজীব অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মেজো খালা খাদিজা বেগম আর মতিঝিলে বড় খালা জাহানার বেগমের বাসায় থেকে, কঠোর পরিশ্রমে স্নাতক পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন ওই তরুণ।

তিতুমীর কলেজে পড়াশোনার ফাঁকে একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করে আর আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় নিজের পাশাপাশি ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে কিশোর বয়সী দুই ভাই পড়ে গভীর অনিশ্চয়তায়।

ওই ঘটনার জন্য হাই কোর্ট রাজীবের দুই ভাইকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনে আইন সংশোধন ও নতুন করে বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু আপিল বিভাগ ক্ষতিপূরণের আদেশ স্থগিত করে একটি স্বাধীন কমিটি করে দিতে বলে, যাদের কাজ হবে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা।

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত ওই কমিটি গত অক্টোবরে যে প্রতিবেদন দেয়, তাতে স্বজন পরিবহন, বিআরটিসি ও শমরিতা হাসপাতালকে দায়ী করা হয়। এরপর সড়কে আরও অনেক মৃত্যু আর নানা ডামাডোলে রাজীবের মৃত্যুর বিষয়টি অনেকটা ভুলেই বসেছিলেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার মর্মান্তিক ওই ঘটনার বছর পূর্তির দিনে রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল রুল শুনানির জন্য হাই কোর্টে মৌখিক আবেদন করেন। তার আবেদনের ভিত্তিতে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাই কোর্ট বেঞ্চ রুল শুনানির জন্য আগামী ১০ এপ্রিল বেলা ২টায় সময় ঠিক করে দেয়।

গতবছর সেই দুর্ঘটনার পর বিআরটিসি বাসের চালক ওয়াহিদ এবং স্বজন পরিবহনের বাসের চালক খোরশেদকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। গত এক বছরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছে এক দফা, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আর আদালতে জমা পড়েনি।

নতুন তদন্ত কর্মকর্তা শাবাগ থানার এসআই ইদ্রিস আলী বলেছেন, এ মাসেই তিনি তদন্ত শেষ করতে চান। কিন্তু এখন আর কারও কথায় ভরসা রাখতে পারছেন না রাজীবের বড় খালা জাহানারা।

বুধবার  তিনি বলেন, “কী হবে জানি না। এক বছরে যেহেতু কিছুই হয় নাইৃ অনেকে তো আমাদের অনেক কথা দিছিল। বাউফলের উপজেলা চেয়ারম্যান (মজিবর মুন্সী) বলছিল আমাদের যে সড়কটা আছে সেইটা পাকা করে রাজীবের নামে নামকরণ করবে।

ইউনিয়নের (বাউফলের দাসপাড়া ইউনিয়ন) চেয়ারম্যান (জাহাঙ্গীর মোল­া) বলছিল একটা টিউবয়েল দেবে, এমপি (আ স ম ফিরোজ মোল­া) সাহেব বলছিল ওর (রাজীব) নামে একটা মাদ্রাসা করে দেবে, কবরস্থানটা বান্ধায়া দেবে। এগুলা আসলে এক বছরে কিছুই হয় নাই। এতিম সন্তান, ওর লাশের সামনে দাঁড়ায়া অনেকে অনেক কথা দিছে। আসলে কেউই কোনো কথা রাখে নাই। আমাদের এছাড়া কী বলার আছে! কিছুই তো বলার নাই।

রাজীবের খালা আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ তো অনেক কিছুই বলেৃ অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়। ওর লাশের সামনে যে কথাগুলো হইছিল, এখন বোঝা গেল এইগুলা সবই রাজনৈতিক বক্তৃতা।

রাজীবের মৃত্যুর পর সড়কের বিশৃঙ্খলা এবং বাস চালকদের বেপরোয়া আচরণ নিয়ে যখন সারা দেশে সমালোচনা চলছে, তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে থেকে অন্যরকম প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। রাজীব হাত বাইরে রেখে বাসে বসেছিলেন কিনা, তিনি অসতর্ক ছিলেন কি না- এসব প্রশ্নও এসেছিল সে সময়।

তবে দুর্ঘটনার দায় নিরূপণে আপিল বিভাগের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  ওই পরিণতির জন্য তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের কোনো দায় কমিটি পায়নি। বরং যে দুই চালক বিআরটিসি আর স্বজন পরিহনের বাস দুটি চালাচ্ছিলেন, ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্সই তাদের ছিল না।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি গত বছর ১৫ অক্টোবর তাদের প্রতিবেদন হাই কোর্টে জমা দেয়।

৪৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার জন্য স্বজন পরিবহনের চালকের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করে বলা হয়, হালকা বাহন চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার পরও স্বজন পরিবহন ওই চালককে নিয়োগ করায় রাজীবের মৃত্যু ও দুর্ঘটনার মূল দায় মূলত স্বজন পরিবহনেরই।

এছাড়া হালকা বাহন চালানোর লাইসেন্স থাকার পরও চালককে বিআরটিসি ডাবল ডেকার বাস চালানোর অনুমোদন দেওয়ায় এই দুর্ঘটনার দায় কিছুটা বিআরটিসিরও। বিআরটিসির বিদ্যমান লিজভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় গণপরিবহনে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চালক নিয়োগ করে গণপরিবহন চালানো এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয় দায় নিরূপণ কমিটির প্রতিবেদনে।

সেখানে বলা হয়, আহত রাজীবের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ার পরও শমরীতা হাসপাতাল তার চিকিৎসায় সময় ক্ষেপণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) ‘গোল্ডেন আওয়ার রুলস’ অনুযায়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে সঙ্কটাপন্ন রোগীর অস্ত্রোপচার করার নিয়ম রয়েছে। কারণ সঙ্কটাপন্ন রোগীর জীবন-মরণ ওই এক ঘণ্টার ওপর অনেকটা নির্ভর করে।

শমরীতা হাসপাতাল রাজীবের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযথা সময় নষ্ট করেছে; সে কারণে শমরীতা হাসপাতাল রাজীবের মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

প্রতিবেদনে রাজধানীর গণপরিবহণ ব্যবস্থার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকার জনসংখা প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ। তার বিপরীতে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বাহনের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ; যা মোট যানবাহনের ৭৪ শতাংশ।

এছাড়া ঢাকার তিনশর মত রুটে ৩ হাজার ৮০০ মালিকের প্রায় ৫ হাজার গণপরিবহন চলে; যা মোট যানবাহনের ০.৫ শতাংশ। বেপরোয়া গাড়ি চালনা রোধে কমিটির সুপারিশে বলা হয়, দৈনিক বা ট্রিপ ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দ্রুত নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কোম্পানির অধীনে চালক নিয়োগ করতে হবে। চলাচলকারী গণপরিবহনের রুট পারমিটের ক্ষেত্রে ‘ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেম’ চালুরও সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

সেখানে বলা হয়, অনুমোদিত চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোকে একটি কোম্পানির অধীনে এনে ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেমে রুট পারমিট দিতে হবে। প্রত্যেকটি রুটের কালার কোড থাকলে বাস কোম্পানি ও পরিবহনের চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযেগিতা ঠেকানো যাবে।

রাজধানীতে গণপরিবহনের, বিশেষ করে ব্যক্তি মালিকানা বা সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসির বাসগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয় উলে­খ করে প্রতিবেদনের বলা হয়, ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকার পরও অনেক বাসেই ইন্ডিকেটর, উয়াইপার, হেডলাইট, টায়ার, বাসের দরজা-জানালা এবং অবস্থা ভয়াবহ।

সুপারিশে বলা হয়, কোনো বোসের ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকলেই চলবে না, সেফটি ফিচারগুলো রঙ করা থাকতে হবে। ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো যানবাহনই চলতে দেওয়া উচিৎ না। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে আরও বেশ কিছু বিষয়ে সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয় কমিটির প্রতিবেদনে।

বুয়েটের সিভিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন সদস্য হিসেবে ছিলেন ওই কমিটিতে।

ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদনকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বুধবার শুনানির তারিখ পাওয়ার পর বলেন, টাকা দিয়ে রাজীবের মৃত্যুর ক্ষতি মাপা যাবে না। কিন্তু তার ছোট দুই ভাইয়ের জন্য ক্ষতিপূরণের টাকাটা খুবই প্রয়োজন।

রাজীবের দুই ভাইয়ের মধ্যে মেহেদী হোসেন যাত্রাবাড়ীর তামীরুল মিল­াত কামিল মাদরাসার অষ্টম আর ছোট ভাই আবদুল­াহ একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ওই মাদ্রাসার ছাত্রাবাসেই তারা এখন থাকছে। কিন্তু বড় ভাইকে হারিয়ে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা পড়েছে, তা কাটার কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না।

কাজল বলেন, রাজীবের ছোটো দুই ভাই এতিম, তাদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণটা খুবই দরকার। এ বিষয়টা নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। এই আইনজীবী বলেন, রাজীবের মামলাটির মূল বিষয়বস্তু ছিল সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের চলাচল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে নিরাপত্তা করার জন্য বিদ্যমান আইন ব্যবহার করা অথবা নতুন আইন করা।

পরবর্তীতে সড়ক নিরাপত্তা আইন নামে নতুন আইন হলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। আমি আশা করি এই মামলাটি রুলের মাধ্যমে যদি নিষ্পত্তি হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারও কোনো ব্যর্থতা থাকলে কিংবা তাদের দায়িত্বে অবহেলা থাকলে, তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে। পাশাপাশি আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টির কিছুটা নিরসন হবে। সুতরাং মামলাটি জরুরি ভিত্তিতে শুনানি করা দরকার।

রাজীবের খালা জাহানারা বেগম বলেন, আমরা চাই বিচার হোক। আসলে বিচার না হইলে তো এটার দৃষ্টান্ত হয় না। এতগুলো অ্যাকসিডেন্ট হইছে, একটারও যদি বিচার হয়, তাইলে কিন্তু দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, অ্যাকসিডেন্ট কমবে। অ্যাকসিডেন্ট কিন্তু মোটেও কমে নাই, অহরহ অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে। দু-একটার বিচার হলে এ ধরনের অন্যায়গুলো কম করবে ড্রাইভাররা।

আর যারা রাজীবের মৃত্যুর পর নানা প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কথা রাখার সুযোগ তাদের এখনও আছে। আমাদের আশা উনারা যে একটা এতিম সন্তানের লাশের সামনে দাঁড়াইয়া কথা দিছে, কথাডা রাখবেন। উনারা যে কথা দিছেন, এইডা যেন বক্তৃতা না হইয়া কথাডা যেন রাখেন।

বাবা-মা হারা রাজীবকে নিজের সন্তানের মত মানুষ করার কথা জানিয়ে কাঁদতে কাঁতে এই নারী বলেন, আজকের দিনটায় দাও দাও করে আগুন জ্বলে। এগুলোর বিচার হোক, তাও তো ওর আত্মা শান্তি পাইব যে- অন্যায় করছে যারা, তাদের বিচার হইছে। আর ওর ভাইরা যদি ক্ষতিপূরণের কিছু টাকাও পায়, তাও তো ওদের জীবনটা কিছুট হইলেও চলবে।

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.