বন্যার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের উপর

দেশজুড়েই দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় কবলিত। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় সব হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ স্থানে মানবেতরভাবে বাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। বন্যার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের উপরও।

খোদ সরকারি হিসেবই বলছে, দেশের ১৮ জেলার শুধুমাত্র মাধ্যমিকের ১ হাজার ১২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪৪ জন শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে। এর বাইরে প্রাথমিক, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েক লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। যদি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে তা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশান উইং-এর তথ্যমতে, মঙ্গলবার (২৮ জুন) পর্যন্ত ১৮ জেলার ৮৫টি উপজেলার ১ হাজার ১২২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার কবলে পড়েছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪৪ জন। এর মধ্যে ৮৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যায় পনিবন্দি হওয়ায় কোনোভাবেই ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়। তবে ১২৩টি প্রতিষ্ঠানে পুরোপুরি ক্লাস নেওয়া ও ১০৩টি প্রতিষ্ঠানে আংশিক ক্লাস নেওয়া সম্ভব বলে উঠে এসেছে জরিপে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ২৬৩টি ও সিলেটে ১৭৫টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশান উইং-এর পরিচলাক প্রফেসর মো. আমির হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আপাতত কতটি প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে সেই হিসেব করা হয়েছে। এখন কোন প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা হবে।
কোন শিক্ষা অঞ্চলে কতজন শিক্ষার্থী বন্যায় কবলিত?

মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশান উইং-এর তথ্যমতে, দেশে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সিলেট, রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও ঢাকা বোর্ডের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার কবলে পড়েছে। তবে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্যার কবলে পড়েনি। সবচেয়ে বেশি বন্যার কবলে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।

তথ্যমতে, সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার ৬ উপজেলার ৭৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৩ হাজার ৮৮ জন, সিলেট বোর্ডে সিলেট জেলার ১৩ উপজেলার ৩০৬টি প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৩৬ জন শিক্ষার্থী, সুনামগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলার ২৬৩টি প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮৬ জন শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার জেলার ৫ উপজেলার ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের ৩৮ হাজার ৩৫৯ জন শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে।

রংপুর বোর্ডের বন্যায় কবলিত গাইবান্ধা জেলার ৪ উপজেলা ২১টি প্রতিষ্ঠানের ৬ হাজার ৪২০ জন শিক্ষার্থী, কুড়িগ্রাম জেলার ৭ উপজেলার ১২৮টি প্রতিষ্ঠানের ২৮ হাজার ৯৫৪ জন শিক্ষার্থী, লালমনিরহাটের ২ উপজেলার ৬টি প্রতিষ্ঠানে ৯৯০ জন শিক্ষার্থী।

কুমিল্লা বোর্ডেরও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৩ উপজেরার ৭টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৮৪৯ জন শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে।

ময়মনসিংহ বোর্ডে বন্যার কবলে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার এক উপজেলার ২টি প্রতিষ্ঠানের ৩২৫ জন, টাঙ্গাইল জেলার ৫ উপজেলার ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার ৮৪৮ জন, জামালপুর জেলার ৪ উপজেলার ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ১১ হাজার ৫২০ জন, কিশোরগঞ্জ জেলার ৫ উপজেলার ৩২টি প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ১৮৯ জন, শেরপুর জেলার এক উপজেলার ১টি প্রতিষ্ঠানের ৩৭৪ জন, নেত্রকোনা জেলার ১০ উপজেলার ১৩৬টি প্রতিষ্ঠানের ৪৬ হাজার ১৬ জন।

রাজশাহী বোর্ডের বগুড়া জেলার ২ উপজেলার ৮টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৪২৫ জন, সিরাজগঞ্জ জেলার ৩ উপজেলার ২১টি প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ১৭৬ জন শিক্ষার্থী বন্যার কবলে পড়েছে।

ঢাকা বোর্ডের নরসিংদী জেলার এক উপজেলার ৬২৯ জন, মানিকগঞ্জ জেলার ২ উপজেলার ২টি প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ১৬০ জন শিক্ষার্থী বন্যা কবলিত হয়েছে।

বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাখাতেও

বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে দেশের শিক্ষাখাতে। মাধ্যমিকে পাশাপাশি অন্তত কয়েক সহস্রাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বন্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যপুস্তকও হারিয়ে ফেলেছে। আবার অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ায় পড়াশোনা করতে পারছে না। এদের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি সমমানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক লক্ষাধিক।

স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। আবার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে পানি জমে আছে। পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন এখন বন্যাদুর্গত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার নবীনগরে বসবাসরত শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার। তিনি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। তানিয়া আক্তার বলেন, হঠাৎ বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। ঘরে ছিল গলা পানি। ভিজে নষ্ট হয়ে যায় বইপত্র। এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে তাই পড়ালেখা করতে পারছেন না।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর আনোয়ারপুর গ্রামে আরেক পরীক্ষার্থী স্নিগ্ধা মৈত্র বলেন, বন্যায় আমার সব বই নষ্ট হয়ে গেছে। লাইব্রেরিতে গাইড পাচ্ছি না। ফলে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিতে পারছি না।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোশিউজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী আমরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করব।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ জানান, বন্যা পরিস্থিতির উন্নয়ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মেরামতে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কবে?

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্থগিত করা হয়েছে চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। ঈদের ছুটির পরপরই পরীক্ষা আয়োজনের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। তবে তা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। আর এসএসসি পরীক্ষার দুই মাস পর নেওয়া হবে এইচএসসি ও সামমান পরীক্ষা।

তিনি আরও বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা চেষ্টা করবো ঈদের ছুটির আগেই সংশোধিত রুটিন প্রকাশ করার, যাতে শিক্ষার্থীরা কিছুদিন পড়ার সুযোগ পায়।

এর আগে গত শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, বন্যা চলে গেলেই কোনও পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে বাধা থাকবে না। শিক্ষার্থীরা অনায়াসে পরীক্ষা দিতে পারবে। তখনই পরীক্ষা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.