পাবনায় ১৫ জেলার ৬ শতাধিক চরমপন্থীর আত্মসমর্পণ

 

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

২০০০ সালের শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চারু মজুমদারের কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জড়িয়ে পড়ি নিষিদ্ধ ঘোষিত বাম সংগঠনের সাথে। সেই থেকে অন্ধকার জগতের প্রভাবশালী জীবন যাপন আর পালিয়ে ফেরা। সরকার সুযোগ দিয়েছেন আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছি, তবে আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। আমৃত্যু শেখ হাসিনার ভ্যানগার্ড হিসেবে নিজেদের আত্মোনিয়োগ করবো।

এভাবেই কথা দিলেন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল লাল পতাকার রাজশাহী-নওগাঁ এলাকার নেতা আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আর্ট বাবু। একই দলের পাবনা এলাকার ইকবাল শেখের স্ত্রী রতœা শেখ অত্যান্ত আবেগ তারিত হয়ে বলেন, আমার স্বামী নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের সাথে জড়িত বলে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারিনি। দিনের পর দিন স্বামী পালিয়ে থাকায় অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন চালাতে হয়েছে। মাসের পর মাস বছরের পর বছর স্বামীর সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি এই ডিজিটাল যুগেও। খুবই কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হতো। আমার মতো অনেকের স্বামী আজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন বলে সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনউদ্দিন স্টেডিয়ামে জেলা পুলিশের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের ১৫ জেলার ৫৯৫ জন চরমপন্থী। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তারা উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।

তারা আরও বলেন, সন্ত্রাসী জীবনে জড়িয়ে পরিবার, স্ত্রী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়িয়েছেন। দিনরাত মিলিয়ে খুব একটা ঘুমাতেও পারেননি। পুলিশ প্রশাসন আর প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী সব সময় তাড়া করে ফিরত তাদের। অনিশ্চিত জীবনে ছিল না এতটুকু শান্তি। তাই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অত্মসমর্পণ করা চরমপন্থীরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি ও বাংলাদেশ পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কাছে ৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬১৪টি দেশি অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন চরমপন্থী দলের সদস্যরা। তাদের মধ্যে পাবনা, নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, রাজশাহী, রংপুর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, রাজবাড়ী, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর জেলার সক্রিয় বিভিন্ন চরমপন্থী দলের সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন।

এসব দলের মধ্যে রয়েছে- পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল লাল পতাকা, পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, নিউ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ও কাদামাটিসহ কয়েকটি সংগঠন।

আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আব্দুল আলীম, বাবলু ব্যাপারী, ইকবাল শেখ, আব্দুর রাজ্জাক আর্ট বাবু, আতাউর রহমান মোবারক, মহসীন আলী, মহসিন মলি­ক, ফারুক হোসেন মোল­া, আব্দুল­াহ আল মামুন, লিপু মোল­া ও রমজান আলীকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পুরস্কার হাতে তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, রাজশাহী-আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক, পাবনা-১ আসনের শামসুল হক টুকু, পাবনা-৪ শামসুর রহমান শরিফ ডিলু, পাবনা-সিরাজগঞ্জ মহিলা আসনের নাদিরা ইয়াসমিন জলি, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি খুরশিদ হোসেন, জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে জলদস্যু, বনদস্যু, জঙ্গী, মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মসমার্পণ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় চরমপন্থীরাও আত্মসমর্পণ করছেন। দেশের উগ্রপন্থি বিপথগামীদের দেশে শান্তির জন্যে আমরা এই পন্থা অবলম্বন করেছি। তারা তো এদেশেরই মানুষ, এই রাষ্ট্রেরই মানুষ, পথচ্যুতদের সুযোগ দিতে হবে বলেই চরমপন্থীদের এই আত্মসমর্পণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, বিস্ফোরক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। তারা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। আত্মসমর্পণকারীদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হবে। অপরদিকে তাদের পুনর্বাসনের জন্যে সরকার ইতিমধ্যেই আর্থিক প্রণোদনাসহ সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.