দেশে নির্মিত সবচেয়ে বড় দুটি জাহাজ ভারতে রফতানি

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

জেএসডবিøউ সিংহগড় ও জেএসডবিøউ লোহগড় নামে বাংলাদেশে তৈরি সবচেয়ে বড় দুটি জাহাজ প্রতিবেশী ভারতে রফতানি করলো বাংলাদেশ। প্রতিটি জাহাজ বিক্রি হলো ৫০ কোটি টাকা করে। ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে এ দুটি জাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে জাহাজ দুটি হস্তান্তর করা হয়। ভারতের ‘জিন্দাল স্টিল ওয়ার্কস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান জাহাজ দুটি বুঝে নেয়। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে ওয়েস্টার্ন ক্রুজ নামের একটি প্রমোদ তরীতে জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিটি জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ৮ হাজার ডিডবিøউটি (ডেডওয়েট টনেজ)। তিনি বলেন, ‘মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরুর দিন এ দুটি জাহাজ ভারতের জিন্দাল স্টিল ওয়ার্কসের কাছে হস্তান্তর করা হলো। আট হাজার ডিডবিøউটি ধারণ ক্ষমতাবিশিষ্ট কার্গো জাহাজ এর আগে কখনও বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। এই দুটি জাহাজই এখন পর্যন্ত দেশে নির্মিত সবচেয়ে বড় জাহাজ। ভারতের কাছে রফতানি করা এ দুটি জাহাজ বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।’

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে ভারতের জিন্দাল স্টিল ওয়ার্কস ওয়েস্টার্ন মেরিনকে চারটি জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়। এই প্রকল্পটি ভারত থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ মূল্যের রফতানি আদেশ। এরমধ্যে প্রথম দুটি জাহাজ জেএসডবিøউ রায়গড় ও জেএসডবিøউ প্রতাপগড় ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। অপর দুটি জাহাজ জেএসডবিøউটি সিংহগড় ও জেএসডবিøউ লোহগড় আজ হস্তান্তর করা হলো। প্রতিটি জাহাজের বিক্রয় মূল্য আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা করে চারটি জাহাজের মূল্য ২০০ কোটি টাকা।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন শোহাইল হাসান বলেন, ‘দুটি জাহাজের প্রত্যেকটি ১৩০০ কিলোওয়াট ও ৯০০ আরপিএম ইয়ানমার মেরিন ইঞ্জিন দ্বারা চালিত, যা শতভাগ লোডেড অবস্থায় সর্বোচ্চ ১০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম। জাহাজগুলো মুম্বাই ও গোয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত জয়গড় বন্দর থেকে মহারাষ্ট্রে অবস্থিত ধরমতার বন্দরে খনিজ লোহা এবং কয়লা বহন করবে।’

বাংলাদেশের দুঃসময়ে ভারত অনেক সহযোগিতা করেছে বলে মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। অনেক নেতিবাচক কথা বলা হয়েছে। অনেকে বলেছেন এই দেশ টিকবেই না। আবার কেউ বলেছেন বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ঢুকে যাবে। সময় প্রমাণ করেছে, আমরা আশেপাশের অনেক দেশ থেকে অনেক ভালো অবস্থায় এসেছি। আজকের এই জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠান (জাহাজ রফতানি) সেটাই প্রমাণ করে। বাংলাদেশ আজ সেই নেতিবাচক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের আজকের বাংলাদেশ সারা পৃথিবীর কাছে বিস্ময়।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কখনও ভারতের কথা ভুলতে চাই না। আমরা জাতি হিসেবে কখনও অকৃতজ্ঞ হতে চাই না। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি কৃতজ্ঞ। কারণ আমি নিজে তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভারত থেকে অনেক সাপোর্ট পেয়েছি। আমার বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনিও ভারতের কাছ থেকে সাপোর্ট পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের এক কোটি মানুষকে জায়গা দিয়েছে। তাই আমরা আমাদের সেই দুঃসময়ের বন্ধুকে কখনও ভুলতে চাই না।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আমরা তৈরি পোশাক শিল্পও ভারতে রফতানি করি। আরও অনেক পণ্য আমরা ভারতে রফতানি করি। আজকের বিশ্ব যৌথ অংশধারী ব্যবসায়ের। গত কিছুদিন আগে আমরা ভারতের পূর্বাঞ্চলে গিয়েছিলাম। সেখানেও কথা বলে এসেছি। ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকায় কোনও সমুদ্র বন্দর নেই। কিন্তু, আমাদের সমুদ্র বন্দর আছে। এই সমুদ্র বন্দর আমাদের অ্যাডভেন্টেজ। এটি আমাদের প্রয়োজন যেমন মেটাবে তেমনি আমরা পরিকল্পনা নিলে এই সমুদ্র বন্দর থেকে প্রচুর আয়ও করতে পারি। ভারতকে ব্যবহার করতে দিলে আমরা এই সমুদ্র বন্দর থেকে প্রচুর আয় করতে পারবো। ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য মোংলা পোর্ট, চট্টগ্রাম পোর্টের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। আমাদের পাশে ভারত, নেপাল ও ভুটান আছে। আমরা যদি তাদেরকে আমাদের এই সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করা সুযোগ দেই। তাহলে আমরা প্রচুর লাভবান হবো।’

ভারতীয় হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাশ বলেন, ‘এই দুটি জাহাজ রফতানি নিশ্চয় আমাদের দুই দেশের বাণিজ্যকে আরও বাড়াবে। পারসেপশনাল দিক থেকে তাকালে আমরা বাংলাদেশ থেকে দুটি জাহাজ কিনছি, এটি খুব ভালো স্টোরি। তাই আমি খুবই গর্বিত আমি এই ধরনের একটি পর্বের অংশ হতে পেরেছি।’ রিভা গাঙ্গুলী দাশ বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্টে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশই জয়সূচক অবস্থানে থাকবে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় সব সেবাই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দেবে। অভ্যন্তরীণ জাহাজের ক্ষেত্রে যদি দেখেন, ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্টে যেখানে ৬ হাজার জাহাজ আছে বাংলাদেশের, আর ভারতের রয়েছে মাত্র ৩৮ থেকে ৩৯ জাহাজ। তাই ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। আর আমাদের জন্য নর্থ-ইস্ট-এ সংযোগ স্থাপন। মুম্বাই থেকে আগে কিছু আসতে যে সময় যেত তার থেকে অনেক কম সময় লাগবে। আর আগে সড়ক পথে আনতে হতো, এখন মুম্বাই থেকে সেসব পণ্য নৌপথে নেওয়া যাবে।’

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.