চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পুরোধা মুহম্মদ খসরুর প্রস্থান

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
শুধু সিনেমার জন্য কখনো লেখক কখনো সম্পাদক কখনো আবার সংগঠক হিসেবে পাঁচ দশকের ক্ষ্যাপাটে আন্দোলন সাঙ্গ করে চোখ বুজলেন মুহম্মদ খসরু। বিকল্প ধারার একজন চলচ্চিত্রকারকে উদ্ধৃত করে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান লিখেছেন, রুশ লেখকরা যেমন গোগলের ওভারকোট থেকে বেরিয়েছে, তেমনি আমরা সব বেরিয়েছি খসরু ভাইয়ের পকেট থেকে। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরুর বয়স হয়েছিল সত্তরের বেশি। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন জানান, শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে গত ১৭ ফেব্র“য়ারি বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন খসরু। বয়সজনিত আরও কিছু সমস্যা তার ছিল।
খসরু ভাই চাইতেন না তার জন্মদিন পালন করা হোক। আমরা জানতাম তার জন্ম ১৯৪৮ সালে, তবে তারিখটা আমাদের কখনও বলতেন না। মুহম্মদ খসরুর বাবা ছিলেন ভারতের হুগলী পাটকলের কর্মকর্তা। দেশভাগের পরপর সেখানেই তার জন্ম।
সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে তাদের পরিবার ১৯৫০ এর দশকে চলে আসে ঢাকায়; খসরুরা থাকতে শুরু করেন কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরে। মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই কাটিয়েছেন অকৃতদার এই মানুষটি।
পটুয়া কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) নকশা কেন্দ্র চালু হলে সেখানে আলোকচিত্রী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন মুহম্মদ খসরু। ফটোগ্রাফি, সিনেমা আর বইয়ের নেশায় তার আর সংসার করা হয়নি।
সিনেমাকে একটি বিশুদ্ধ শিল্পমাধ্যম হিসেবে সিরিয়াস চর্চার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে ১৯৬৩ সালে খসরুসহ আরও কয়েকজনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা পায় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’। সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্তের গড়া কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি ছিল তাদের অনুপ্রেরণা।
পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের শুরুটায় আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, আবদুস সবুর, সালাহ্উদ্দিন, মনিরুল আলমসহ অনেকেই ছিলেন। ধীরে ধীরে তাদের সবাই ব্যস্ত হয়ে গেছেন অন্য জীবনে। খসরুই তখন এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
পাঁচ দশক আগে সেই সময় বিদেশি সিনেমা যোগাড় করা ছিল খুবই কঠিন। কিন্তু খসরুরা সে সময় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে দেখিয়েছেন ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার নানা ভাষার চলচ্চিত্র। দেশি বিদেশি বোদ্ধাদের নিয়ে ওয়ার্কশপ- সেমিনার করে তরুণদের মধ্যে চলচ্চিত্রের শুদ্ধতার বীজ বুনে দিতে চেয়েছেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার সময় খসরু ছিলেন উদ্যোক্তাদের একজন। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ না থাকায় কিউরেটর হিসেবে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।
মুহম্মদ খসরু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের তত্ত¡াবধানে ফিল্ম স্টাডি সেন্টার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তারই উদ্যোগে।
ভারতের আদলে ফিল্ম কো-অপারেটিভ গঠন করে স্বল্পদৈঘ্য সিনেমা নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও তার ভূমিকা ছিল।
চলচ্চিত্র বিষয়ক সাময়িকি ধ্র“পদী, চলচ্চিত্রপত্র, ক্যামেরা যখন রাইফেলসহ বিভিন্ন প্রকাশনার সম্পাদনা করেছেন মুহম্মদ খসরু। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ধরা হয় এই পত্রিকাগুলোকে।
চলচ্চিত্রকার ঋত্তি¡ক ঘটক, রাজেন তরফদার, শামা জায়েদী ও আদুর গোপাল কৃষ্ণানের সঙ্গে তার কথোপকথন নিয়ে ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘সাক্ষাৎকার চতুষ্টয়’। ১৯৭৫ সালে রাজেন তরফদারের পরিচালিত ‘পালঙ্ক’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন খসরু। পরে নিজেও সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে তা আর হয়নি।
হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ অবলম্বনে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে বেশ কিছুদিন ঘুরেও প্রযোজক জোগাড় করতে পারেনি খসরু। দুই দফা আবেদন করেছিলেন সরকারি অনুদানের জন্য, কিন্তু সাড়া মেলেনি।
নিজের স্বপ্নের সিনেমাটি বানাতে না পারলেও খসরু ছিলেন এ দেশের তরুণ নির্মাতাদের পথ দেখানোর বাতিঘর। তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ অনেকেই সেই ঋণ স্বীকার করে গেছেন বিভিন্ন সময়ে।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের আজীবন সম্মাননা।
সাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ভাষায়, বাংলাদেশে যে তরুণেরা কখনও শিল্পের প্রেমে চলচ্চিত্র চর্চায় বা নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে পরিচিত নন।
“আশির দশকের মাঝামাঝি ঘনিষ্ঠতা হয়েছে তার সঙ্গে। দেখেছি, কেমন ঘোরগ্রস্তের মতো তরুণদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন চলচ্চিত্রের পথে। এ ব্যাপারে তিনি আপসহীন। চলচ্চিত্র বা চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ে কোনো বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার প্রবণতা দেখলে তিনি সে তরুণের ব্যাপারে হয়েছেন নির্মম, চলচ্চিত্রের অপরিণত কোনো কাজ করে যে তরুণ আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে, তার তৃপ্তির বেলুনটিকে ফুটো করে দিয়েছেন তীব্র খিস্তিতে, প্রশ্রয় দেননি চলচ্চিত্রকে ঘিরে কোনো রকম স্থূলতা, কৃত্রিমতা, বালখিল্যতাকে। যেন তিনি স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছেন সুস্থ চলচ্চিত্রের ট্রাফিকম্যানের ভূমিকা। কোনো প্রাপ্তিযোগের আশায় তা করেননি।”

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.