May 20, 2024
জাতীয়লেটেস্ট

গণমাধ্যমে সবার আইনি সুরক্ষায় কাজ করতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক

স¤প্রচারমাধ্যমে সবার আইনি সুরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, দেশে স¤প্রচার নীতিমালা হয়েছে। আমরা এ আইন পাস করতে পারলে এর আলোকে স¤প্রচারমাধ্যমের কর্মীদের চাকরি সুরক্ষা হবে। এছাড়া স¤প্রচারমাধ্যমের সবার জন্য আইনি সুরক্ষায় এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) সেমিনার হলে বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিকদের সংগঠন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার-বিজেসি আয়োজিত ‘স¤প্রচার মাধ্যমের সংকট’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মন্ত্রী একথা বলেন।

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, নবম ওয়েজবোর্ডে স্পষ্ট বলা আছে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য একটি আলাদা নীতিমালা করতে হবে। আমি মনে করি নবম ওয়েজবোর্ডের সুপারিশের আলোকে একটি নীতিমালাও করা প্রয়োজন, যাতে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার শ্রমিক, কর্মচারী, সাংবাদিক সবার জন্য আইনি সুরক্ষা থাকে। সে লক্ষ্যে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমি কাজ করবো। স¤প্রচার আইন ও গণমাধ্যমকর্মী আইন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আমরা আশা করবো, খুব সহসা আমরা এটি মন্ত্রিসভা হয়ে পার্লামেন্টে নিয়ে যেতে পারবো।

গণমাধ্যম মালিকদের উদ্দেশে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের বলবো, সাংবাদিকদের বঞ্চিত করবেন না। সময়মতো বেতন পরিশোধ করবেন। কারণ গণমাধ্যমকর্মীরা অনেক কষ্টে কাজ করেন, তারা যদি সবাই কর্মবিরতি করে, তাহলে চ্যানেল চলবে না। সেটি তারা করছে না। তাদের ধন্যবাদ যে, খেয়ে না খেয়ে, তিনমাস বেতন না পেয়ে তারা কাজ করছে। তাদের এ দরদ সবার অনুধাবন করা প্রয়োজন, যাতে অহেতুক কারো চাকরচ্যুতি না ঘটে।’

ড. হাছান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই এই প্রাইভেট টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে তিনি যখন সরকার গঠন করেন তখনই তিনি প্রথম প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দেন। স¤প্রচার মাধ্যম অর্থাৎ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বাংলাদেশে গত ১১ বছরে তিন গুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে।

‘২০০৯ সালে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার ক্ষমতা নেন, তখন বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ছিল ১০টি। এখন টেলিভিশনের সংখ্যা স¤প্রচারে আছে প্রায় ৩৪টি, আমরা লাইসেন্স দিয়েছি ৪৫টিকে। অর্থাৎ আরো কিছু স¤প্রচারে আসবে। আমি মন্ত্রণালয়ে যে সমস্যাগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি সেগুলো সমাধানের জন্য প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভুত সমস্যা হঠাৎ করে সমাধান করে দেওয়া যায় না, একটু সময় প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন চলে যাচ্ছিল, সেটি তো আর যাচ্ছে না। এখন যারা মালিক পক্ষ নিশ্চয়ই জানেন, ছয় মাস আগের তুলনায় টেলিভিশনগুলো অনেক ভালো চলছে। যেটা সিঙ্গাপুরে অন্য কোম্পানির মাধ্যমে চলে যেত, আর হুন্ডি হয়ে টাকা চলে যেত, সেটা বন্ধ হয়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। একটি পদক্ষেপ নেওয়ার পর কার্যকর হতে কয়েক মাস সময় লাগে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা নাটক পায় না, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনচিত্রে যারা অভিনয় করে তারা ঠিকমতো কাজ পাচ্ছে না, আমাদের দেশে ছেলে-মেয়েরা অনেক স্মার্ট এবং তারা ভালো বিজ্ঞাপন বানায়। ইদানীং আমরা দেখতে পাচ্ছি কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে বিদেশি সিরিয়াল নিয়ে এসে ডাবিং করে সেগুলো স¤প্রচার করা হচ্ছে, এমনকি ৩০ বছরের পুরনো সিরিয়ালও।

‘বাংলাদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপন বিদেশে বানিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অনেক ভালো ভালো শিল্পী থাকা সত্তে¡ও বিদেশে সেকেন্ড গ্রেডের শিল্পী দিয়ে সেগুলো তৈরি করা হচ্ছে। এতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারেও উদ্যোগ নিয়েছি, এজন্য ট্যাক্স দিতে হবে। এ উদ্যোগ কেউ নেয়নি।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই বিদেশি সিরিয়াল প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিয়ে প্রচার করার জন্য পরিপত্র জারি করেছি। যারা চালাচ্ছে তারা অনুমতি নিচ্ছে। যেখানে একটি সিনেমা সেন্সরবোর্ড অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। সিরিয়ালের জন্যও আমরা একটি কমিটি করে দিচ্ছি খুব সহসা।  ‘টিআরপি করার জন্য সরকার কী লাইসেন্স দিয়েছে’ এমন প্রশ্ন রেখে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যারা টিআরপি করে, সরকারের কাছে তারা কি অনুমতি নিয়েছে? এভাবে চলতে পারে না, আমরা সেটি আলোচনা করেছি মন্ত্রণালয়ে। খুব সহসা টিআরপি নীতিমালা হবে এবং যারা টিআরপি করবেন, তারা সরকারের অনুমতি নিয়েই করতে হবে। যে কেউ টিআরপি করবেন না। টিআরপি কিভাবে হয় সেটিও আমার মোটামুটি জানা আছে। টেলিভিশনের সিরিয়াল ঠিক করতে যেমন নানা দেন-দরবার হয়। টিআরপি করার ক্ষেত্রে যে এগুলো হয় না, তা নয়। সুতরাং এক্ষেত্রে আমরা একটি নিয়ম নীতির প্রবর্তন করতে যাচ্ছি। এখানেও আমরা একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবো বলে আমি আশা করছি।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিজ্ঞাপন পড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ৩০ শতাংশ বিজ্ঞাপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন যেতে পারে, কিন্তু সেটি ট্যাক্স সরকার পাচ্ছে না, এভাবে যেভাবে ইচ্ছা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী বিজ্ঞাপন দিয়ে দিবে, আমরা কী সবাই বিদেশি রেজিস্টার্ড কোম্পানির জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি করছি যে তাদের  বিজ্ঞাপন দিয়ে দিবো, আর টাকাগুলো ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দিয়ে দিবো?’

মন্ত্রী বলেন, যেখানে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে ডাবিং করা সিরিয়াল আনতে টাকা লাগে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে যাওয়ার আগে স্যাটেলাইট ফি দেওয়ার জন্য সরকারের অনুমোদন লেগেছে, সেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিচ্ছে কোনো অনুমোদন ছাড়া। পয়সাগুলো ক্রেডিট কার্ড থেকে নিয়ে নিচ্ছে। এভাবে রাষ্ট্রের টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানির কাছে, এটি কি সমীচিন?  এ নিয়ে আমি সবার সঙ্গে কথা বলেছি এনবিআর ও অন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। আমরা কিছু নিয়ম নীতি সেখানে করতে যাচ্ছি। সেখানে কিসের ভিত্তিতে সেখানে বিজ্ঞাপন যাবে এবং ট্যাক্স ভ্যাট আদায় করবো।’

ফেসবুকের তথ্যমন্ত্রী বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে যোগাযোগ মাধ্যমে মধ্যে ফেসবুকই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তাদের সরকারের পক্ষ থেকে অনেকগুলো প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তারা যেন এখানে অফিস করেন, প্রয়োজনে এখানে একটা কোম্পানি করেন যাতে আইডি কার্ডের মাধ্যমে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়।

‘এখানে ১০ বছরের ছেলেও অ্যাকাউন্ট খুলছে, একজনে ২০ টি অ্যাকাউন্ট খুলছে, ফেক আইডি দিয়ে খুলছে। সেখানে তো কোনোভাবেই কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। যদি সেখানে আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে যদি কেউ খুলে, একজন ১৬ বছরের বাচ্চাও খুলতে পারবে, কিন্তু অনুমতি লাগবে।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এক সময় আমাদের দেশে মোবাইল সিম কার্ড নিতে কোনো অনুমতি লাগতো না, যে যেমন ইচ্ছা ১০০টা নিলেও কোনো সমস্যা হতো না। সেটিকে আমাদের সরকার রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনেছে। একজন ব্যক্তি কয়টা সিমকার্ড ব্যবহার করতে পারবেন সেটিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। কোম্পানির জন্য কয়টা পারবে সেটিও বলা আছে। আমি তো মনে করি ফেসবুকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম অবশ্যই প্রবর্তন হওয়া উচিত।

মোবাইল অপারেটরদের উদ্দেশ্যে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে শুধুমাত্র নেটওয়ার্ক পরিচালনাকরার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তাদের ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে সেটিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অথবা অন্যমাধ্যমে প্রচার করা আবার সেখানে বিজ্ঞাপন নেওয়ার জন্য আবার টাকা নেওয়ার এই লাইসেন্স তো দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। এখানেও প্রচুর বিজ্ঞাপন চলে যায়। একজনের ডোমেইনে আরেকজনের আগ্রাসন করা সঠিক নয়। এটি আইন বহির্ভূত। এটি যাতে না হয়, এখানে যাতে একটি পরিপূর্ণ শৃঙ্খলা আসে সেজন্য আমরা কাজ করছি।’

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান বলেন, ‘আমি সবসময় মন্ত্রী থাকবো না, সুতরাং আমি আপনাদের একজন। আমি ছোটবেলা থেকে সংবাদকর্মী। আমাকে প্রধানমন্ত্রী এই দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি আপনাদের হয়ে, আপনাদের দৃষ্টিতে বিষয়গুলোকে দেখার চেষ্টা করি। এরপরও দায়িত্বে থাকলে সবপক্ষের কথা শুনতে হয়। সেখানে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হয়। এটিও আশা করি আপনারা অনুধাবন করবেন। এই কাজ যত চ্যালেঞ্জই হোক, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবো, গণমাধ্যমের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে।’

অনুষ্ঠানে ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পিআইবির মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ, একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল বাবু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *