কিছুই শেষ হয়নি, আবার উঠে দাঁড়াব : মির্জা ফখরুল

দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
নির্বাচনের রেশ কাটিয়ে নেতা-কর্মীদের শৃক্সখলাবদ্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে লড়াইয়ে ডাকলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভোটের পর ধর্ষিত নারীকে দেখতে শনিবার নোয়াখালীতে যাওয়ার পর সেখানে এক মতবিনিময় সভায় দলের নেতাকর্মীদের চাঙা করার প্রয়াস চালাতে দেখা যায় বিএনপি মহাসচিবকে।
পাঁচ বছর আগে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর ভোট ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েও পারেনি বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবার নির্বাচনেও এলেও ভরাডুবি হয়েছে তাদের; যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, ভোট ডাকাতি করে তাদের হারানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সামর্থ্য নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রশ্ন তোলার মধ্যে নোয়াখালীর সভায় ফখরুল বলেন, যে কথা আমরা বার বার বলেছি- জেগে উঠুন, আপনাদের অধিকার রক্ষা করুন। আমরা রক্ষা করতে পারিনি। কেন পারিনি আমরা? পারি নাই এজন্য যে আমরা সুশৃক্সখল নই। আমরা মরার আগেই মরে যাচ্ছি? কেন মরে যাচ্ছি? কেন উঠে দাঁড়াচ্ছি না?
ক্ষোভ হয় না? রাগ হয় না? উত্তেজনা হয় না? নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন বিএনপি মহাসচিব। তাদের আশা দেখিয়ে তিনি বলেন, একটা সুযোগ আমরা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন তৈরি করে তাদেরকে পরাজিত করতে। তাই বলে কি সব শেষ হয়ে গেছে? হয়নি। কিছুই শেষ হয়নি। আমরা আবার রুখে দাঁড়াব, আমরা আবার উঠে দাঁড়াব। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে। আমার যে বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এর প্রতিশোধ নেব, আমার যে ভাইয়ের ঘর পোড়ানো হয়েছে, তার প্রতিশোধ আমরা নেব। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে সকলে উঠে দাঁড়ান, বিজয় হবে।
ভোটের দিন ধর্ষণের শিকার নারীকে নোয়াখালীর হাসপাতালে গিয়ে দেখে এবং এই ঘটনার বিচারে সোচ্চার থাকার প্রতিশ্র“তি দিয়ে মতবিনিময় সভায় যান ফখরুল। নোয়াখালী জেলা শহরে পৌঁছার পর সড়কে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।
ফখরুল বলেন, আজকে এখানে তরুণদের মাঝে যে ক্ষোভ দেখলাম, যে উচ্ছাস দেখলাম, এই ক্ষোভকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। এরা (সরকার) চোরাবালির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এরা ইতোমধ্যে জনগণের শত্রু হয়ে গেছে। সুতরাং তাদেরকে পরাজিত করতে আপনাদের যা প্রয়োজন তা শুধু ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য। জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারব।
ভোটের দিনের ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, একাত্তর সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর হায়নারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর এই বাংলাদেশে একটি সরকার তার সমস্থ প্রশাসনকে নিয়ে ওই বাংলাদেশের মানুষের উপর ঠিক একই কায়দায় হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আমাদের যে অধিকার সেই অধিকার তারা কেড়ে নিলো। আমরা বাধা দিতে পারিনি।
ভোটের পর প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য উদ্ধৃত করে ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার মিটিং বলেছেন যে, দানবীয় আচরণ করবেন না, দানবে পরিণত হবেন না। আপনি তো দানব হয়ে গেছেন। আমি বলি না, এস কে সিনহা সাহেব (সাবেক প্রধান বিচারপতি) বলেছেন, এটা দানব তৈরি হয়েছে। সেই দানব থেকে মুক্তি পেতে হবে, পাথর বুক থেকে সরাতে হবে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে একটি জায়গায় ঐক্যফ্রন্টে নিয়ে আসতে হবে, তবেই আমাদের জয় হবে।
নোয়াখালীসহ সারাদেশে নির্বাচনী সহিংসতায় যারা আহত হয়েছেন, তাদেরকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সহানুভূতি জানান ফখরুল। ক্ষতিগ্রস্থদের আইনি সহযোগিতা দিতে বিএনপির আইনজীবীদের নির্দেশনা দেন তিনি।
নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে জেলা জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভায় ঢাকা থেকে যাওয়া ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বক্তব্য রাখেন।
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোকন, জেলা আইনজীবী সমিতির নেতা এ বি এম জাকারিয়া, আবদুর রহিম, আবুল কাশেমও বক্তব্য রাখেন।
বরকতউল্লাহ  বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, হারুনুর রশীদ, রেহানা আখতার রানু, সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের হাবিবুর রহমান খোকাও উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার নোয়াখালীর হাসপাতালে গিয়ে সুবর্ণচরে ভোটের দিন ধর্ষিত নারীর সঙ্গে কথা বলেন ও তার চিকিৎসার খবর নেন।
দশম সংসদের মেয়াদ ফুরোনোর আগে একাদশ সংসদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ‘বেআইনি’ কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব। নোয়াখালীর এই মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, উনি (শেখ হাসিনা) তড়িঘড়ি করে শপথ নিয়েছেন। আপনি তো ভোটে জিতেন নাই। আপনার শপথ নেওয়া বেআইনি। এই সংসদের (দশম) মেয়াদ আছে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত, সেই সংসদ বাতিল করেছে, এটা আমি কোনো পত্রিকায় দেখি নাই।
তাহলে বাংলাদেশে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদ সদস্য হলে ৬০০! ওই সংসদ বাতিল না করে কীভাবে শপথ নিলেন আপনারা? এই শপথ বেআইনি ও অবৈধ। আপনার শপথ সংবিধানবিরোধী ও নীতি-নৈতিকতা বিরোধী।
১৯৮৮ সালে সব দলের নির্বাচনের বর্জনের মধ্যে গঠিত সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রব বলেন, ভোটের তারিখ ছিল ৩০ তারিখ, ২৯ তারিখে ব্যালট শেষ। আমি ১৯৫৪ সালে ভোট দিতে গেছি, সেই থেকে এই পর্যন্ত সব ভোট দেখেছি, পৃধিবীর বিভিন্ন দেশের ভোটের ইতিহাস আমি পড়েছি, এরকম ভোট কোখাও হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। এটা ঘৃণা করার ভাষা নেই।
সুবর্ণচরে ধর্ষিত নারীর প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, এদের আক্রমণে সুবর্ণচরের এক মহিলার শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে, তার শরীরে সিগেরেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে। আমার সেই বোনকে আমরা দেখতে এসেছি। একাত্তরের যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, এই হায়নারের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে মান-ইজ্জত নিয়ে কেউ বাঁচতে পারবে না।
সভায় কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী বলেন, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। আজকে আইন নেই, বিচার নাই, প্রশাসন নাই, পুলিশ নাই। সব দলীয় হয়ে গেছে। এদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে হলে প্রথম নিজেকে তৈরি করতে হবে। সকলে শৃঙ্খলাবদ্ধ হোন।
শেখ হাসিনাকে ‘জননেত্রী’ সম্বোধন করতেন উলে­খ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আমাকে বলেছেন, ‘ভাই এরপরও আপনি জননেত্রী বলেন’। আমি বলেছিলাম, বলতে বলতে অভ্যাস হয়ে গেছে।
গত ২ জানুয়ারি আমি তাকে জননেত্রীর আসন থেকে, আমার অন্তর থেকে ত্যাগ করেছি। উনি (শেখ হাসিনা) যদি সারা পৃথিবীর বাদশাও হোন তাহলেও বঙ্গবন্ধুর একজন নগণ্য শিষ্য হিসেবে আমি যে জননেত্রী বলতাম, সেটা না বলা তার সবচাইতে বড় ক্ষতির হবে। আইনজীবী সমিতিতে মতবিনিময় সভার পর ঢাকার পথে রওনা হন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।
পথে বেগমগঞ্জে শরীফপুর ইউনিয়নের মুরাদপুর গ্রামে ভোটের পর জ্বালিয়ে দেওয়া বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম শাহিনের বাড়িতে যান ফখরুলরা। এ সময় ওই এলাকার সাবেক সাংসদ ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ্‌ বুলু ও তার স্ত্রী শামীম আরা লাকীসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে সেনবাগে জয়নুল আবদিন ফারুকের বাড়িতে যান ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ফেনীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যানর আবদুল আউয়াল মিন্টুর বাড়িতেও যান ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.