কাগজে-কলমেই ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’

রাজধানীর মিরপুরের ‘নিউমার্কেট শপিংমল’-এর ভেতরে-বাইরে বড় হরফে লেখা ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’। অথচ মার্কেটের ফটকে মাস্ক না পরে ঢোকার সময় কাউকে বাধা দিতে দেখা যায়নি।

শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) বিকেল ও শনিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্রেতা মাস্ক ছাড়াই মার্কেটে ঢুকছেন। অনেকে আবার মার্কেটে ঢুকেই মাস্ক খুলে পকেটে রাখছেন।

মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আনোয়ার হোসেন জানালেন, ক্রেতাদের মাস্ক পরে প্রবেশের কথা বললেই খারাপ ব্যবহার করেন। তবে আগের চেয়ে মাস্ক পরার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে।

শুধু এই মার্কেটই নয়, মিরপুর ১০ ও ২ নম্বরের অধিকাংশ মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। তবে এর বিপরীতচিত্রও দেখা গেছে কিছু মার্কেট ঘুরে। সনি স্কয়ার মার্কেটসহ বেশকিছু ফ্যাশন হাউজের শো-রুমে মাস্ক ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে গেলে বাধা দিতে দেখা গেছে।

সনি স্কয়ারের নিরাপত্তাকর্মী সাইদুর রহমান বলেন, অনেকেই মাস্ক ছাড়া আসছেন। তাদের মাস্ক ছাড়া প্রবেশ নিষেধ জানানো হচ্ছে। বাইরে থেকে কিনে মাস্ক পরে তারপর প্রবেশ করছে।

কিউরাস ফ্যাশন হাউজের একজন বিক্রয়কর্মী জানান, তাদের শো-রুম ছোট। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। কষ্ট হলেও বিক্রয়কর্মীরা সবাই মাস্ক পরছেন। যখন কাস্টমার থাকছে না, তখন হয়তো মাস্ক খুলে রাখছেন।

সনি স্কয়ারে খাবার খেতে আসা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম মাস্ক ছাড়া প্রবেশ করছিলেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মাস্ক পরেছিলাম। কিছু সময়ের জন্য খুলেছি। পকেটেই মাস্ক আছে, পরে নিচ্ছি।’

মোবাইল ফোনে কথা কথা বলেতে বলতে মিরপুর শাহ আলী মার্কেটে ঢুকছিলেন আমিনুল। তার মুখেও ছিল না মাস্ক। নো মাস্ক, নো এন্ট্রির সরকারি নির্দেশনার বিষয়ে জানেন কি না, জানতে চাইলে রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘মোবাইলে কথা বলার সময় মাস্ক থাকলে একটু সমস্যা হয়। এজন্য খুলেছি, ভেতরে যাওয়ার সময় আবার পরবো।’

জানা গেছে, ২০২০ সালে ২৪ নভেম্বর করোনার সংক্রমণরোধে সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ অর্থাৎ মাস্ক পরিধান ছাড়া কাউকে কোনো সেবা দেওয়া হবে না বলে নির্দেশনা জারি করে। এরপর ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি’ বা মাস্ক ছাড়া প্রবেশ নিষেধের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। গণপরিবহন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিনোদনকেন্দ্র, মার্কেটে এমন নির্দেশনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই।

গণপরিবহনে নেই ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি’
গণপরিবহনে মাস্ক পরার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। কয়েক মাস আগেও বাসের জানালা, দরজায় ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি’ লেখা থাকলেও, তা এখন নেই।

গণপরিবহন ঘুরে দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেও যাত্রীদের মধ্যে নেই তেমন সচেতনতা। গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি অনেকটাই গায়েব। যাত্রীদের অধিকাংশই মাস্ক পরছেন না, যারা পরছেন তারাও ঠিকঠাক পরছেন না।

শনিবার মিরপুর, নর্দা, বাড্ডা এলাকারে বাসে উঠে দেখা গেছে, মাস্ক পরেনি এমন যাত্রী তুলছেন হেল্পাররা। অধিকাংশ হেল্পারের মুখেই ছিল না মাস্ক। বেশিরভাগ বাসেই দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে দেখা গেছে। স্যানিটাইজার দিয়ে যাত্রীদের হাত পরিস্কারের বিষয়টি উঠে গেছে বাস থেকে।

মাস্ক ছাড়া যাত্রী ওঠানোর কারণ হিসেবে অছিম বাসের হেল্পার মইনুল ইসলাম বলেন, যাত্রীরা মাস্ক পরতে চান না। আমরা তো চুক্তিতে বাস নিয়ে চালাই। দিনশেষে ভাড়ার টাকা মেলাতে হয়। এজন্য কোনো যাত্রীকে না করতে পারি না।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, হেল্পার, ড্রাইভার দিয়ে গণপরিবহণে স্বাস্থবিধি মেইনটেইন করা সম্ভব নয়। এটা কোনো সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। স্টপেজে যাত্রী মাস্ক পরে উঠছে কি না, যাত্রীদের হাতে স্যানিটাইজার দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা, খোঁজ রাখতে হবে। যাত্রী নামানোর পরে একটা পয়েন্টে বাসগুলোকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিচ্ছন্ন করতে হবে।

দেশে গত কয়েকদিনে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন সংক্রমণ ১৮ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গত সোমবার মন্ত্রী বলেন, ‘এভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে হাসপাতালে করোনা রোগীদের জায়গা হবে না।’ সংক্রমণ নিয়ে সরকার চিন্তিত ও আতঙ্কিত বলেও জানান জাহিদ মালেক।

স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা তৈরি না হওয়া প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন জারি করে মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। এসব কাজে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন করতে হয়। সেখানে উদ্বুদ্ধ করতে হয়, বাধ্য করতে হয়। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হয়। এ জায়গায় আমাদের দুর্বলতা আছে। সম্পৃক্ততার অভাবে মাস্কে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘মাস্ক পরার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহ দিতে হবে। অন্যদিকে মাস্ক পরাতে সবাইকে বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় গণতদারকি কমিটি করে সবাইকে মাস্ক পরার কথা বলতে হবে, প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে।’

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published.