September 11, 2026
আঞ্চলিকজাতীয়লেটেস্টশীর্ষ সংবাদস্বাস্থ্য

হাম-ডেঙ্গুতে মৃত্যু লাগামহীন

* ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ৪ জনসহ ১৩ জনের প্রাণহানি
* হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু ২৫ সেপ্টেম্বর

জে এফ জয়
হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ দুই রোগে খুলনা বিভাগে চারজনসহ সারাদেশে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধে মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগের ৪ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ২ জন এবং খুলনা জেলায় ডেঙ্গুতে ২ জন মারা গেছেন। একই সময়ে ১০ জেলায় হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে নতুন করে আরও ৩৭৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ২৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২৬০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৪ জন। সর্বোচ্চ ভর্তি দেখা গেছে খুলনা জেলায় ৯৫ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে মোট ৮ হাজার ১৯৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৭ জন। বর্তমানে ৯৩০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৯০ জন নতুন সন্দেহজনক হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় সর্বোচ্চ ২১ জন ভর্তি হন। এই সময়ে ঝিনাইদহে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়।
হামে সারাদেশে ৭ মৃত্যু ও ভর্তি হাজারের বেশি : দেশে গত একদিনে হামের উপসর্গ থাকা আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন ২৯ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মোট ১০০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০০ জন। উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে।
অধিদপ্তরের বৃহস্পতিবারের বুলেটিনে বলা হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৩ জন, সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৪০৭ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৫৭ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯৩, চট্টগ্রামে ৬৬, বরিশালে ৫৭, ময়মনসিংহে ৭৭, খুলনায় ৩৮ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে।
বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ১৬৫ জন হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১২ জন। ঢাকা বিভাগে ভর্তি ৩৬৪ জন, রাজশাহীতে ৩১, সিলেটে ১৫৩, চট্টগ্রামে ২৬২, বরিশালে ১১৬, ময়মনসিংহে ৮২, খুলনায় ৯০, রংপুরে ১৪ জন।
ডেঙ্গুতে ৬ জনের প্রাণহানি ও হাসপাতালে ১৪৯২ : দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ৪৯২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে দুজন খুলনা বিভাগের; একজন করে আছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের। সরকারের হিসাবে, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১৩৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে চলতি মাসে প্রাণ গেছে ৪২ জনের।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এ রোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ৮১ জন ভর্তি হয়েছেন, দক্ষিণ সিটিতে ভর্তি হন ১৫১ জন। দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হন ৩২৭ জন।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৭৮ জন, চট্টগ্রামে ২০২ জন, খুলনায় ২৮৪ জন, ময়মনসিংহে ৮০ জন, রাজশাহীতে ১২২ জন, রংপুরে ৫৪ জন ও সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, গেল ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৩০৪ জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। চলতি বছর ৪৮ হাজার ৪৩০ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন হাসপাতাল ছেড়ে গেছে।
হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন ২৫ সেপ্টেম্বর শুরু : টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ না কমায় দেশে আবারও বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর এ ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মধ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় চার সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যা শেষ হয় ২০ মে। তারপরও সংক্রমণ কমছে না। সরকারি হিসাবে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে বুধবার পর্যন্ত ১০০২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের টিকা ক্যাম্পেইন শেষ করার পরও যখন সংক্রমণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন সরকার অবশিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার দেশে কোনো টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার কথা বলেছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ধানমণ্ডির ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজে ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষ্যে সেমিনারটি আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিজঅ্যাবলড পিপল (এডিপি) ও রোটারি ক্লাব আহসান মঞ্জিল।

শেয়ার করুন: