নিরাপত্তা পেলে দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত সাকিব
দক্ষিণাঞ্চল ডেস্ক
নয়া দিল্লিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বলেছেন, সরকার যদি তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে তিনি দুই বছরের নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরতে চান এবং হত্যা মামলাসহ সব অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতেও তিনি প্রস্তুত।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেছেন, তিনি কোনো ‘অন্যায় করেননি’; তাই আদালতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান প্রমাণ করতেই তিনি দেশে ফিরতে চান। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব এখন শ্রীলঙ্কায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছেন।
টেলিফোনে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এখনও তিনি অবসর নেননি। দেশে ফিরে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলার পাশাপাশি ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে খেলাই তার লক্ষ্য।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন সাকিব। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি তার।
সাকিব রয়টার্সকে বলেন, সরকার যদি আমাকে জানায় যে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, তাহলে আমি আনন্দের সঙ্গেই দেশে ফিরব, আদালতের বিচারসহ যা যা প্রয়োজন, সবকিছুরই মুখোমুখি হব। তিনি বলেন, আমি জানি, আমি কোনো অন্যায় করিনি।
শেখ হাসিনা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরতে চান। কেবল তিনি নন, নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
রয়টার্সকে সাকিব বলেছেন, তিনি অবশ্যই ‘যত দ্রুত সম্ভব’ দেশে ফিরতে চান। তবে তা সম্ভব না হলে ‘শেখ হাসিনার সঙ্গেই’ দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন। তার ভাষায়, ক্যাপ্টেন যা বলেন, আমরা সেটাই অনুসরণ করি। আমার মনে হয়, তারাই ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন, আর আমরা তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করব।
বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভার্চুয়ালি একটি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন সাকিব। এরপর বাংলাদেশে তার ফাঁকা বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে তিনি শুধু “শান্তি এবং বাংলাদেশের উন্নতির কথা” বলেছেন। এ জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।
সাকিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ পুলিশের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তার ভাষায় ‘বানোয়াট’ মামলাগুলো প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। তবে কোনো উত্তর পাননি। দেশে ফেরার বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও কথা বলার ইচ্ছার কথা বলেছেন সাকিব।
রয়টার্স লিখেছে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ৩৯ বছর বয়সী সাকিব অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি দেরি করতে চান না।
রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, আমি বেশির ভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলছি। ভালো লাগছে, খেলাটা উপভোগ করছি, ভালো খেলছিও। কিন্তু বয়স এখন আর আমার পক্ষে নেই। তাই খুব বেশি অপেক্ষা করতে পারব না।
২০২৪ সালের শেষ দিকে একবার অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে দেশে ফেরার জন্য বিমানে উঠেছিলেন সাকিব। কিন্তু সেবারও তার দেশে ফেরা হয়নি।
ওই ঘটনা নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তরে সাকিব বলেন, বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন করে দেশের পথে রওনা হওয়ার বিষয়টি তিনি নিশ্চিতও করেছিলেন। কিন্তু মাঝপথেই তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। তিনি দুবাইয়ে নেমে সেখান থেকে আবার নিউ ইয়র্কে ফিরে যান।
সাকিব বলেন, ১২ ঘণ্টার মধ্যে কী বদলে গেল, আমি জানি না।
তার দাবি, প্রায় ৫৭ দিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও তিনি সেবার দেশে ফিরতে পারেননি।
এরপর আরেকবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে।
সাকিব বলেন, দেশে ফিরতে না দেওয়ার কারণ হিসেবে ওই পোস্টের কথাই তাকে সে সময় বলা হয়েছিল। আমি বুঝতে পারি না, বাংলাদেশে আমাকে ঢ়ুকতে না দেওয়ার মানদণ্ড কীভাবে এটা হতে পারে।
সাবেক এই এমপি বলেন, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে-এমন পরামর্শও তিনি পেয়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে তার অবস্থান স্পষ্ট, এটা বিবেচনা করার প্রশ্নই আসে না।
সাকিব বলেন, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা সচল রয়েছে। একটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে, অন্যটি দুর্নীতির অভিযোগে। তিনি দাবি করেন, হত্যা মামলাটি যেদিন দায়ের করা হয়, সেদিন তিনি কানাডার টরন্টোতে একটি ম্যাচ খেলছিলেন। তার ভাষায়, এটা হাস্যকর একটা মামলা।
সাকিবের দাবি, তদন্তের কারণে গত দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে। তবে কোন কোন ব্যাংকে হিসাব রয়েছে বা কত টাকা আটকে আছে, সেসব বিষয়ে কিছু তিনি বলতে চাননি।
এই ক্রিকেটার বলেন, যে ব্যক্তি গত ১০ বছর দেশের সবচেয়ে বেশি কর দেওয়া খেলোয়াড়দের একজন, যে সব কর পরিশোধ করেছে, তার অ্যাকাউন্ট যদি দেড় বছর ধরে তদন্তের নামে জব্দ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমি দেব। কিন্তু তদন্ত করে কিছু না পেলে তো ছেড়ে দেওয়া উচিত।
সাকিব জানান, গত দুই বছর ধরে তিনি তার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।
তার বাবা-মা বাংলাদেশেই রয়েছেন, তাদের বিদেশে যেতে ‘দেওয়া হয়নি’ বলে দাবি করেন তিনি।
সাকিব বলেন, আমাদের সবার জন্য সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা টিকে আছি।
দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন/ জে এফ জয়

