‘জুলাই চেতনা’-ছায়া মন্ত্রিসভার কড়া সমালোচনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছরে লুটপাটের যে মহোৎসব চলেছে তার চিত্র শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। গড়পড়তা প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দিয়ে কয়েক ডজন পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। একইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পুঁজি করে কোনো বিশেষ দলের ‘রাজনৈতিক ব্যবসা’ ও ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, এতে হয়তো ‘উজিরে খামখা’ বা মন্ত্রী সেজে থাকার সুখ পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
বিগত সরকারের লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, আওয়ামী লীগ আমলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা দিয়ে ২৪টি পদ্মা সেতু বা ১৪টি মেট্রোরেল বানানো সম্ভব ছিল। বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, কে বড় মুক্তিযোদ্ধা সেই বাহাস না করে আসুন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিই। ব্যাংক দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে ব্যাংক দখল হতো গোয়েন্দা সংস্থার ভয় দেখিয়ে, আর এখন অনেকে ‘নারায়ে তাকবীর’ বলে দখল করছে, এই দখলদারি বন্ধ হওয়া জরুরি।
ব্যাংক দখল ও লুণ্ঠন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ আর বর্তমান সময়ের মধ্যে দখলের স্টাইল হয়তো ভিন্ন হয়েছে, কিন্তু লুণ্ঠন বন্ধ হওয়া জরুরি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করার যে কোনো অপচেষ্টা বিএনপি বরদাশত করবে না। বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিল মূলত নির্বাচনের স্বার্থে অনেক কিছুতে আপস করে। কিন্তু সংবিধানে থাকা বিতর্কিত তফসিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও ভাষণ সংক্রান্ত বিধানগুলো কেন এখনো বিলুপ্ত করা হয়নি, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি স্পষ্ট জানান, অসাংবিধানিক কোনো নির্দেশ বা জুলাই সনদের বাইরের কোনো ফর্মুলা বিএনপি মেনে নেবে না।
মন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামে রক্তের পথ মাড়িয়ে আজ আমরা এই অবস্থানে এসেছি। এই ইতিহাসকে খাটো করার চেষ্টা করবেন না। আওয়ামী লীগ আমলে দরিদ্রদের হক যেভাবে ধনীরা লুট করেছে এবং যেভাবে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, সেই বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে কেবল চেতনার রাজনীতি করলে দেশ এগোবে না। তিনি বিরোধী দলকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদীয় রীতিনীতি মেনে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করাই হবে প্রকৃত রাজনীতি। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই সব সংস্কার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বাধীনতার কথা থাকলেও তা অবারিত নয়। বর্তমানে দেশে-বিদেশে বসে যেভাবে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কুৎসা রটানো হচ্ছে, তাতে আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার নামে এই কলঙ্কিত ধারা বেশি দূর এগোতে দেওয়া হবে না। গালিগালাজের প্রতিযোগিতায় যারা চ্যাম্পিয়ন হতে চান, তাদের কঠোর বাধানিষেধের আওতায় আনতে আইন মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পুঁজি করে কোনো বিশেষ দলের ‘রাজনৈতিক ব্যবসা’ বরদাশত করা হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের গঠিত ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, এতে হয়তো ‘উজিরে খামখা’ বা মন্ত্রী সেজে থাকার সুখ পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে।
জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব নিয়ে বিরোধী দল এনসিপির অবস্থানের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একটি দল ৭১-এর চেতনা বিক্রি করতে করতে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে নতুন করে ব্যবসার চেষ্টা চলছে। জুলাই বিপ্লব এ দেশের সব মানুষের ত্যাগের ফসল।

