খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে অনিয়ম : দুই ঠিকাদার ও ছয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
দ. প্রতিবেদক
খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুই ঠিকাদার ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ছয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রবিবার দুদকের উপসহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান বাদী হয়ে খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন। একটি মামলায় কাজ না করেই ঠিকাদারকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য মামলায় ঠিকাদারের অনুকূলে অর্থ ছাড় করে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে স্থানান্তরের অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহাবুব রহমান, কেডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস ও উপসহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান।
একই ঘটনায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি তিন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান, সদস্য (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন এবং সাবেক সচিব মো. বদিউজ্জামানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে কেডিএতে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
কেডিএর কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের ভাষ্য, শিপইয়ার্ড সড়কের কাজ চলাকালে প্রকল্পটির সার্বিক তদারকি করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, তৎকালীন সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ঠিকাদার মাহাবুবুর রহমান প্রকল্পের প্রকৌশলীদের গুরুত্ব দিতেন না। কাজে ভুল থাকলে তা সংশোধন বা এ বিষয়ে চিঠি দিতেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা ভয় পেতেন। বিল তৈরি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই চেয়ারম্যান ও সচিব নিতেন বলে তাঁদের দাবি।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা ১৩ কোটি টাকার বিল তৈরির নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান ও সচিব। তাঁদের নির্দেশে অধস্তন প্রকৌশলীরা বিল তৈরি করেন।
কেডিএর নথি অনুমোদন ও বিল পরিশোধের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিম্নমান সহকারী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পর বিলের নথি সদস্য (প্রকৌশল), সচিব, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) এবং চেয়ারম্যানের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর চেয়ারম্যান ও সচিব যৌথভাবে বিলে স্বাক্ষর করেন।
কেডিএ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী হলেন চেয়ারম্যান। তাঁর নেতৃত্বেই সংস্থার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রকল্প চলাকালে সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কাঠামোয় সচিব ও সদস্যরা পরবর্তী পর্যায়ে রয়েছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তারাও এসব পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্প চলাকালে কেডিএর প্রায় তিনজন সদস্য দায়িত্বে থেকে প্রকল্পটির তদারকি করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের কাউকেই মামলার আসামি করেনি দুদক।
দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও আসামি করা হবে।
প্রসঙ্গত, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ৭ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি। বরং প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সড়কটিতে অভিযান চালায় দুদক। সংস্থাটির পৃথক দুটি অনুসন্ধান গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হয়। এরপরই মামলা দুটি করা হলো।
দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন / জে এফ জয়

