২০২২ কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হোঁচট খাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আর্জেন্টিনা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। লিওনেল মেসির অসাধারণ নৈপুণ্যে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
কাতারের রাজধানী দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা। কিলিয়ান এমবাপের হ্যাটট্রিকও থামাতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দলকে। টাইব্রেকারে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ পারফরম্যান্স আর মেসির স্বপ্নপূরণ মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে সেই শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আর্জেন্টিনার সামনে। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত আধিপত্য দেখিয়ে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে তারা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ঘরের মাঠ ও অ্যাওয়ে- দুই ম্যাচেই হারিয়েছে স্কালোনির শিষ্যরা।
সব মিলিয়ে গত চার বছরে দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনা আবারও অন্যতম ফেবারিট হিসেবেই নামবে এবারের বিশ্বকাপে। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ দলটিতে এখনো আছেন লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, লওতারো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টারদের মতো তারকারা।
বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘জে’-তে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র এক মাস বাকি থাকতে স্কালোনি প্রকাশ করেন ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক দল। এখন প্রশ্ন- কারা জায়গা পাবেন শেষ ২৬ জনের স্কোয়াডে?
যদিও সবার মনে প্রশ্ন জাগছে কবে ঘোষণা হবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড? ব্রাজিল, জার্মানি, ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে অনেক দেশই এর মধ্যে স্কোয়ায় ঘোষণা করে ফেলেছে। আর্জেন্টিনা কবে ঘোষণা করবে? জানা গেছে, ২৮ মে’র মধ্যেই ২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করবেন কোচ লিওনেল স্কালোনি।
গোলরক্ষক
গোলবারের নিচে আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দ যে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ২০২২ বিশ্বকাপ এবং কোপা আমেরিকায় অসাধারণ পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম বড় নায়ক এই অ্যাস্টন ভিলা গোলরক্ষক। বিশেষ করে টাইব্রেকারে তার মানসিক দৃঢ়তা ও সেভ করার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ঙ্কর অস্ত্র। সর্বশেষ তার দারুণ নৈপুণ্যে অ্যাস্টন ভিলা জয় করেছে ইউরোপা লিগ শিরোপা।
তার ব্যাকআপ হিসেবে থাকছেন মার্সেইয়ের জেরোনিমো রুল্লি। এছাড়া অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের হুয়ান মুসো ও ক্রিস্টাল প্যালেসের ওয়াল্টার বেনিতেজও আর্জেন্টিনা দলে জায়গার জন্য লড়াইয়ে আছেন।
খেলোয়াড়
ক্লাব
এমিলিয়ানো মার্টিনেজ
অ্যাস্টন ভিলা
জেরোনিমো রুলি
মার্সেই
হুয়ান মুসো
অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ
ওয়াল্টার বেনিতেজ
ক্রিস্টাল প্যালেস
ফাকুন্দো কাম্বেসেস
রেসিং ক্লাব
সান্তিয়াগো বেলত্রান
রিভার প্লেট
ডিফেন্ডার
রক্ষণভাগে আর্জেন্টিনা এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের জুটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেরা সেন্টার-ব্যাক জুটিগুলোর একটি বলেই ধরা হয়। আগ্রাসী ডিফেন্ডিং, বল কন্ট্রোল ও লিডারশিপ- সবকিছুতেই তারা দুর্দান্ত।
অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দিও এখনো দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। যদিও তিনি জানিয়েছেন, এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ।
ফুলব্যাক পজিশনে নাহুয়েল মোলিনা ও নিকোলাস তালিয়াফিকো স্কালোনির প্রথম পছন্দ। এছাড়া গনজালো মন্তিয়েল, মারকোস আকুনা, কেভিন ম্যাক অ্যালিস্টারদের মতো বহুমুখী ডিফেন্ডারও স্কোয়াডকে গভীরতা দিয়েছে।
খেলোয়াড়
ক্লাব
আগুস্তিন গিয়াই
পালমেইরাস
ফাকুন্দো মেদিনা
লঁস
লেওনার্দো বালের্দি
মার্সেই
ক্রিস্তিয়ান রোমেরো
টটেনহ্যাম হটস্পার
নাহুয়েল মোলিনা
অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ
নিকোলাস ওতামেন্দি
বেনফিকা
লিসান্দ্রো মার্তিনেজ
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
নিকোলাস তালিয়াফিকো
মার্সেই
জার্মান পেজ্জেলা
রিভার প্লেট
গনসালো মনতিয়েল
সেভিয়া
মার্কোস আকুনা
রিভার প্লেট
কেভিন ম্যাক অ্যালিস্টার
ইউনিয়ন সাঁ জিলোয়াজ
মার্কোস সেনেসি
বোর্নমাউথ
লুকাস মার্তিনেজ কোয়ার্তা
রিভার প্লেট
লওতারো দি লোলো
বোকা জুনিয়র্স
জায়েদ রোমেরো
হেতাফে
গ্যাব্রিয়েল রোহাস
রেসিং ক্লাব
নিকোলাস কাপালদো
হামবুর্গার
মিডফিল্ডার
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডই এখন দলের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অংশ। রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস-২০২২ বিশ্বকাপজয়ী এই মিডফিল্ড এখনো স্কালোনির আস্থার জায়গা।
তবে এবার নতুন প্রজন্মও উঠে আসছে জোরালোভাবে। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো, ক্লদিও এচেভেরি ও নিকোলাস পাজদের নিয়ে ইতোমধ্যেই দারুণ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনায়।
তবে ইনজুরির কারণে জিওভানি লো সেলসো ও ভ্যালেন্তিন কার্বোনির বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
খেলোয়াড়
ক্লাব
লিয়ান্দ্রো প্যারেদেস
এএস রোমা
রদ্রিগো দি পল
ইন্টার মিয়ামি
এনজো ফার্নান্দেজ
চেলসি
থিয়াগো আলমাদা
লিঁও
এজেকিয়েল প্যালাসিওস
বায়ার লেভারকুসেন
নিকোলাস পাস
কোমো
ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানো
রিয়াল মাদ্রিদ
অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার
লিভারপুল
ক্লদিও এচেভেরি
ম্যানচেস্টার সিটি
গুইদো রদ্রিগেজ
ওয়েস্টহাম ইউনাইটেড
ম্যাক্সিমো পেরোনে
কোমো
আনিবাল মোরেনো
রিভার প্লেট
মিলতোন দেলগাদো
বোকা জুনিয়র্স
অ্যালান ভারেলা
পোর্তো
এজেকিয়েল ফার্নান্দেজ
বায়ার লেভারকুসেন
জিওভানি লো সেলসো
রিয়াল বেতিস
নিকোলাস দোমিঙ্গেজ
নটিংহাম ফরেস্ট
এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া
অ্যাস্টন ভিলা
ভ্যালেন্তিন বার্কো
রেসিং ক্লাব
তোমাস আরান্দা
বোকা জুনিয়র্স
আক্রমণভাগ
আক্রমণভাগেই সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর্জেন্টিনা। সামনে আছেন লিওনেল মেসি- যিনি সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই হলেও মেসি এখনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
তার পাশে হুলিয়ান আলভারেজ ও লওতারো মার্টিনেজের উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। আলভারেজ অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদে দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে লওতারো কোপা আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন।
এছাড়া হুলিয়ানো সিমিওনে, গারনাচো, ম্যাতিয়াস সুলেদের মতো তরুণরাও স্কালোনির পরিকল্পনায় আছেন। তবে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া অবসর নেওয়ায় আক্রমণভাগে অভিজ্ঞতার একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
খেলোয়াড়
ক্লাব
হুলিয়ান আলভারেজ
অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ
লিওনেল মেসি
ইন্টার মায়ামি
নিকোলাস গনসালেজ
ইউভেন্টাস
হুলিয়ানো সিমিওনে
অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ
লওতারো মার্তিনেজ
ইন্টার মিলান
জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি
বেনফিকা
সান্তিয়াগো কাস্ত্রো
বোলোনিয়া
মাতিয়াস সুলে
এএস রোমা
আলেহান্দ্রো গারনাচো
চেলসি
হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ
পালমেইরাস
মাতেও পেল্লেগ্রিনো
পার্মা কালচিও
আর্জেন্টিনার তারকা খেলোয়াড়
আর্জেন্টিনা মানেই লিওনেল মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপে স্বপ্নপূরণের পরও তার ক্ষুধা শেষ হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে সম্ভবত তার শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। তাই মেসিকে ঘিরে আবেগ এবার আরও বেশি।
তবে শুধুই মেসি নন, বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটি শক্তিশালী হয়েছে সমন্বয়ের কারণে। হুলিয়ান আলভারেজ এখন ইউরোপের অন্যতম ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ড। অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদে দিয়েগো সিমিওনের অধীনে আরও পরিণত হয়েছেন তিনি। সামনে থেকে প্রেসিং, গোল করা ও অ্যাসিস্ট- সবকিছুতেই কার্যকর।
মিডফিল্ডে রদ্রিগো ডি পল স্কালোনির ‘ইঞ্জিন’। তার কর্মক্ষমতা, আগ্রাসন ও লড়াকু মানসিকতা পুরো দলকে উজ্জীবিত করে। অন্যদিকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ মিডফিল্ডে ভারসাম্য এনে দেন।
রক্ষণভাগে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এখন আর্জেন্টিনার মানসিক শক্তির প্রতীক। বড় ম্যাচে তার উপস্থিতিই বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয় পুরো দলকে। আর রোমেরো-লিসান্দ্রো জুটি প্রতিপক্ষ আক্রমণভাগের জন্য বড় মাথাব্যথা।
এছাড়া থিয়াগো আলমাদা ও হুলিয়ানো সিমিওনের মতো তরুণরাও হতে পারেন আর্জেন্টিনার ‘এক্স-ফ্যাক্টর’।
সম্ভাব্য একাদশ (৪-৩-৩)
স্কালোনি সম্ভবত তার পরীক্ষিত ৪-৩-৩ ফরমেশনেই খেলবেন। গোলপোস্টে থাকবেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। রক্ষণে মোলিনা, রোমেরো, লিসান্দ্রো ও তালিয়াফিকো।
মিডফিল্ডে ডি পল ও ম্যাক অ্যালিস্টার নিশ্চিতভাবেই থাকবেন। তৃতীয় জায়গার জন্য এনজো ফার্নান্দেজ ও থিয়াগো আলমাদার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
আর আক্রমণভাগে মেসি, লওতারো ও আলভারেজ- এই ত্রয়ীকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য একাদশ: এমি মার্টিনেজ; মোলিনা, লিসান্দ্রো, রোমেরো, তালিয়াফিকো, ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ, মেসি, লওতারো মার্টিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ।