January 29, 2026
আন্তর্জাতিক

মুসলমানদের যতটা সম্ভব হয়রানির মধ্যে রাখতে হবে: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

আর দুই মাসের মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে। তার ঠিক আগেই রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে দলের কর্মী ও সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছেন, রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলমানদের— যাদের তিনি ‘মিঁয়া’ বলে উল্লেখ করেন— যতটা সম্ভব হয়রানির মধ্যে রাখতে। ২০১৬ সালে আসামে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি বাংলাভাষী মুসলমানদের ঘিরে ধারাবাহিক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে এসেছে। তবে ২০২১ সালে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই বয়ান আরও তীব্র হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে এবার তিনি কোনও রাখঢাক না রেখেই সরাসরি এই জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কথা বলতে শুরু করেছেন। গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ডিব্রুগড়ে একটি সরকারি অনুষ্ঠানের ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমবার প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, বর্তমানে রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সংশোধন (স্পেশাল রিভিশন বা এসআর) প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রায় ৫ লাখ মুসলমান নাগরিকের বিরুদ্ধে বিজেপির কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযোগ দায়ের করছেন। তিনি জানান, এটি কেবল ঘটছে তা নয়, বরং এটাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি বলেন, যদি ‘মিঁয়া মুসলমানদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের না করা হয়, তবে মনে হবে আসামে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর কোনও অস্তিত্ব নেই। তার দাবি, এই জনগোষ্ঠীকে ‘চাপে রাখা’ প্রয়োজন, না হলে তারা জমি, সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক অধিকার দখল করে নেবে। তিনি একে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, এই অবস্থানের মাধ্যমে ‘প্রতিরোধ’ দেখানোই সরকারের লক্ষ্য। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ‘আমরা যদি মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের না করি, তবে মনে হবে আসামে একেবারেই অবৈধ বিদেশি নেই। আমি দলের সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন যত বেশি সম্ভব অভিযোগ দায়ের করে এবং সেটা হবে শুধুমাত্র মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এই সম্প্রদায়ের লোকেদের চাপে রাখতে হবে, না হলে তারা আমাদের মাথার উপর চড়ে বসবে। তারা ভেবেছে আসামের জমি, সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক অধিকার দখল করবে। আমরা যদি এর বিরুদ্ধে কিছুই না করি, তাহলে মনে হবে অসমীয়ারা দুর্বল। এটা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই এবং আমরা মিঁয়াদের এই রাজ্যে শান্তিতে থাকতে দেব না।’ কীভাবে এই ‘চাপ’ সৃষ্টি করা হবে, তাও প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, ‘গুয়াহাটিতে আমি দেখেছি অনেক মুসলমান অটোচালক রয়েছে। তাদের অটোতে উঠবেন এবং নামার পর যদি পাঁচ টাকা ভাড়া চায়, চার টাকা দেবেন। তারা উৎপাত করলে প্রয়োজনে পেটাতে হবে। যেসব জায়গায় তারা কাজের সুযোগ ছিনিয়ে নিয়েছে, সেখানেও আক্রমণ করতে হবে। আমি বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়া কন্টাক্টারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের জানিয়েছি, মিঁয়া মুসলমানদের হটিয়ে স্থানীয় অসমীয়াদের সুযোগ দেওয়া হোক। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে কাজের সুযোগ— সব জায়গায় সম্মিলিত আক্রমণ করতে হবে। অসমীয়া হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব।’ এদিকে তার এই মন্তব্যগুলোকে কেন্দ্র করে রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক। কেউ কেউ বলেছেন, আসামে একসময় প্রতিবাদের পরিবেশ ছিল, কিন্তু এখন সরকার বা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলা নিরাপদ নয়। গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে সরাসরি মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কথা বলছেন, তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র রাজনীতির স্বার্থে একজন মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে সমাজের একটা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কথা বলছেন, এটা শুধুমাত্র দুর্ভাগ্যজনক নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিনি একের পর এক মন্তব্য করছেন এবং সাধারণ মানুষকে বলছেন মুসলমানদের যে কোনোভাবে যেন হেনস্থা করা হয়। যদি তার কথা শুনে তার দলের লোকেরা এ ধরনের কাজ শুরু করে, তাহলে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া আসতে সময় লাগবে না। হয়তো মুখ্যমন্ত্রী এমনটাই চাইছেন। তবে আমরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করব। এই বক্তব্য সংবিধান-বিরোধী এবং আমরা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করে সুপ্রিম কোর্টে তার বিরুদ্ধে মামলা করব।’হাফিজ রশিদ আরও জানান, শুধু মুসলমানরাই নন, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বহু হিন্দুও এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন। এই পরিস্থিতিতে আসাম বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং তা সংবিধানসম্মত ভোটাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে ‘মিঁয়া’ জনগোষ্ঠীর উপর ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিস জারি করা হচ্ছে তাদের চাপে রাখতে ও ভোগান্তিতে ফেলতে। তার অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া আইনসম্মত সংশোধনের বদলে ভয় দেখানো, হয়রানি এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেবব্রত শইকিয়া আরও উল্লেখ করেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী যারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে কোনও এলাকায় বসবাস করেন, তারা সেই এলাকার সাধারণ বাসিন্দা হিসেবে গণ্য হন। যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ বহু দশক ধরে আসামে বসবাস করছেন এবং পূর্ববর্তী সংশোধিত ভোটার তালিকাতেও তাদের নাম ছিল। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের তরফে সরকার বা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও নির্দেশ জারি হয়নি। তবে মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। বরং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার ভাষা আরও তীব্র হয়েছে বলে অভিযোগ। আসাম সংখ্যালঘু ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ইমতিয়াজ আলী বলেন, রাজনৈতিক ভাষা এতটাই নিচে নেমে গেছে যে পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশন দেখা নিয়েও সংশয় তৈরি হচ্ছে। তিনি বৃহস্পতিবার ডিডাব্লিউ-কে বলেন, “এক সময় আমাদের অভিভাবকেরা টিভিতে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মুহূর্ত বা খুব বেশি মারপিটের দৃশ্য চলতে থাকলে টিভি বন্ধ করে দিতেন, কারণ তাদের মনে হতো এর খারাপ প্রভাব পড়বে আমাদের উপর। এখন আমি একজন অভিভাবক এবং আজকাল টিভিতে রাজনৈতিক বয়ান এলে আমি টিভি বন্ধ করে দিই। আমার মনে হয়, এসব কথাবার্তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে খারাপ প্রভাব ফেলবে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে চুরি করা শেখাচ্ছেন—তাও আবার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের চুরি। শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রী পদটি পাওয়ার জন্য তিনি এতটা নিম্নস্তরে নেমে যাচ্ছেন যে তার কথাবার্তার সামাজিক প্রভাবের কথা তিনি ভুলে যাচ্ছেন।’ কংগ্রেস নেতা আমিনুল হক লস্কর একসময় বিজেপির সদস্য ছিলেন এবং ২০১৬ সালে দলের একমাত্র মুসলমান বিধায়ক হন। পরে বিজেপি ছেড়ে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। তখনই তিনি বলেছিলেন, দলের ভিতরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। এবার মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে তার প্রশ্ন— নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করা এবং এ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার আদৌ কি মুখ্যমন্ত্রীর রয়েছে? তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক নয়, বরং দেশের সাংবিধানিক পরিকাঠামোর প্রশ্ন। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি যখন মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন তাকে সংবিধানের শপথ নিতে হয় এবং হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তা নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন আর সরকার এক জিনিস নয়। অতীতেও দেখেছি, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের আগে বিভিন্ন তারিখ ও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেন। নির্বাচন কমিশনের হয়ে তিনি কথা বলছেন। এটা শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের নয়, সংবিধানেরও অবমাননা এবং এর বিরুদ্ধে আদালতেরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই ভাষার পেছনে এক ধরনের রাজনৈতিক ভয় কাজ করছে বলেও মনে করেন আমিনুল হক লস্কর। তিনি বলেন, ‘অতীতেও নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু কথাবার্তার স্তর এতটা নিচে নামেনি। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সব দিকে সমীক্ষা করে দেখেছেন, তার দল নির্বাচনে ভালো ফল নাও করতে পারে। তাই বিজেপির চিরাচরিত কৌশল অনুযায়ী তিনি একটি অশান্ত পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন।’ গত দু’বছর ধরে আসামের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুখ্যমন্ত্রী এবং তার দলের নেতারা একটি শব্দ ব্যবহার করছেন—‘মিঁয়া’। রাজ্যের রাজনীতিতে এটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। এর আক্ষরিক অর্থ বাংলাভাষী মুসলমান হলেও, রাজনৈতিক ব্যবহারে শব্দটি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মুসলমানদের বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির স্লোগান ছিল ‘সরাইঘাটের যুদ্ধ’। লাচিত বরফুকনের সঙ্গে মুঘলদের যুদ্ধকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। এবার আরও একধাপ এগিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে ‘আদি বাসিন্দা বনাম অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ বদলালেও রাজনৈতিক বার্তার অর্থ প্রায় একই থেকে যাচ্ছে।
শেয়ার করুন: