লা ফিয়েস্তায় একদিন !

আবরার,খুলনা।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কিছুদিন আগেও খুলনার মানুষেরা এতটা খাবার প্রেমিক ছিল না, মানে তিন চার বছর আগেও কিন্তু খুলনার মানুষজন রেস্টুরেন্ট রিভিউ, খাবারের মান নিয়ে তেমনটা আগ্রহী ছিল না, বিশেষ করে ইয়ং জেনারেশন। বিগত কয়েক বছরে খুলনা শহরের বেশ কিছু উন্নয়ন হয়েছে তার মধ্যে একটি বিশেষ জায়গা দখল করেছে খুলনার রেস্টুরেন্ট গুলি। এখনকার জামানায় মানুষজন রেস্টুরেন্টে শুধু খাওয়ার জন্যই যায় না, যায় আড্ডা দেওয়ার জন্য, প্রিয়জনের সাথে কিছু মুহুর্ত কাটানোর জন্য, অথবা চিত্তবিনোদনের জন্য। সুতরাং সব দিক থেকে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে খুলনায় এমন কিছু রেস্টুরেন্টের প্রসার ঘটেছে যে গুলা উপরিউক্ত বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে সবার মধ্যে রেস্টুরেন্টে আসা যাওয়া করার জন্য আগ্রহ তৈরি করেছে। ফ্যামিলি কিংবা ফ্রেন্ডস সকল ধরনের অবস্থা বুঝে খুলনায় বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে প্রসার ঘটেছে কিন্তু এরই মধ্যে খুলনায় গড়ে উঠেছে নতুন একটি জায়গা যেটাকে ফুড জোন হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। ফুড জোন একটি বিশেষ জায়গা যেখানে একই সাথে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট ছোট ছোট কার্ট করে স্থান নিতে পারে এবং সবার খাওয়ার জন্য টেবিল কিংবা কোন সুনির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ থাকে যেগুলো বিশেষত ভাবে কোনো রেস্টুরেন্টের জন্য নয় বরং সব রেস্টুরেন্টের কাস্টমাররাই  যেকোনো জায়গায় বসার অধিকার রাখে। এমন একটি ফুড জোন গড়ে উঠেছে খুলনার গল্লামারি ও সোনাডাঙ্গার মধ্যবর্তী স্থানে এবং আমি বিশ্বাস করি কম বেশি সবাই জায়গাটাকে চিনেন। জায়গাটি হচ্ছে “লা ফিয়েস্তা”। লা ফিয়েস্তা একটি স্প্যানিশ শব্দ, বাংলায় বিশ্লেষণ করলে আসে উৎসব বা কোন একটি বিশেষ উৎসব। জায়গাটিতে গেলেও কিন্তু মনে হবে না উৎসবের কমতি আছে ! পরিবার-পরিজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এসে মানুষজন এখানে যথেষ্ট মজা করে খাবার উপভোগ করছে এবং বলাবাহুল্য খাবারের দাম কিন্তু অনেক কম। আজকের ফিচারে আমরা ফিয়েস্তায় যে রেস্টুরেন্ট গুলি আছে সে গুলোর পরিবেশ ও খাবার নিয়ে বেশ কিছু জিনিস তুলে ধরব। 

জায়গাটি কোথায় ?! 

https://goo.gl/EaukCv  – সরাসরি ম্যাপ এড্রেস

 

সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে গল্লামারি দিকে সোজা চলে গেলে অথবা গল্লামারি ব্রিজের একটু আগে সোনাডাঙ্গা যাওয়ার রাস্তার ডানে গেলে লা ফিয়েস্তা ফুড জোন পাওয়া যাবে। জায়গাটিতে যেতে বেশ কষ্ট করতে হবে না আপনার, ইজিবাইক বা রিকশায় চড়ে খুব সহজে যেতে পারেন এখানে। গাড়ি কিংবা বাইক নিয়ে গেল এখানে পার্কিং এর জন্য ব্যবস্থা আছে ।

পরিবেশ 

সম্পূর্ণ ভিউ

 

নামাজের স্থান

 

সাধারণ ফুড জোন গুলো যেমন হয় লা ফিয়েস্তা এর তুলনায় কোন অংশে কম না ,হয়তোবা আরো একটু উন্নত হলে ভালো হতো ( যেমন ওয়াইফাই থাকলে )। তারপরও বাংলাদেশের সাপেক্ষে এবং ঢাকার তুলনায় এটি কোন দিক থেকে পিছিয়ে নেই এর পরিবেশ উন্নত এবং পরিষ্কার। লা ফিয়েস্তাতে গেলে দেখা যাবে এখানে মোট ১২ থেকে ১৩ টি ছোট ছোট খাবারের দোকান বা ফুড কোর্ট আছে এবং প্রত্যেকটি দোকানে কোন না কোন বিশেষ ধরনের খাবার আছে যেগুলো জন্য দোকান গুলোর থেকে ভিন্ন ও বেশ সমাদৃত। ফুড কোর্টের আকার বেশ বড় হওয়াতে অনেক মানুষজন থাকলেও খুব একটা গরম অনুভূত হবে না কারণ এটি একদমই রাস্তার অনেক পাশে এবং বেশ খোলামেলা, একদিক থেকে বলা যায় ভেন্টিলেশনের খুবই সুব্যবস্থা আছে এবং গরমের সময় মাথার উপর থাকবেন ফ্যান এবং কেন জানি মনে হয় বৃষ্টির সময় এখানে বসে একই সাথে খাওয়া-দাওয়া করতে এবং বৃষ্টি উপভোগ করতে বেশ ভালই লাগবে সবার। এখানে ফুড কোর্ট এবং খাওয়ার জন্য টেবিল-চেয়ার ছাড়াও আছে একটি ওয়াশরুম, ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা দুটি বাথরুম এবং একটি নামাজের এবং ওযু করার স্থান যেটা বেশ চোখে পড়ার মতো এবং সাধারণত অন্য কোনো ফুড জোনে দেখা যায় না। দূর্ঘটনাবশত অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও অগ্নিনির্বাপণের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার। 

খাবারের দোকান গুলি 

লা ফিয়েস্তা ঘুরে দেখা গেল মোট দোকানের সংখ্যা হল ১২ থেকে ১৩ টি এর মধ্যে আটটি দোকান পুরোপুরিভাবে সচল এবং বাকিগুলা উদ্বোধনের প্রক্রিয়ায় আছে এবং এক নজরে ঘুরে দোকান গুলো থেকে যে সকল তথ্য জানা গেল সেগুলো আমি আমার সর্বোচ্চ টা দিয়ে আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।

চায়ের আড্ডা 

লা ফিয়েস্তায় ঢুকেই সবার বায়ে ঘড়ির কাটার দিকে প্রথমে যে দোকানটা সেটির নাম হল চায়ের আড্ডা। এ দোকানে বিশেষত্ব হচ্ছে অনেক ধরনের চা এবং কফি পাওয়া যায় এখানে। এটার পাশাপাশি ফুচকাও আছে এখানে। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা পর্যন্ত চা পাওয়া যায় এবং কফি ও ফুচকার দাম ৪০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ টাকার ভেতর। এ দোকানের গ্রাহক প্রিয় চা হল গুড়ের চা এবং লেমন ও দই ফুচকা। যোগাযোগ করা হলে দোকানের কর্মচারীরা বলেন প্রত্যেকদিন কমবেশি ১০০ জনের বেশি ক্রেতা এখানে আসে, ভবিষ্যতে এখানে অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি আইসক্রিম পরিবেশন করার পরিকল্পনা আছে মালিকের। 

ডোলসে ভিতা

 

চায়ের আড্ডার ঠিক ডানপাশে ডোলসে ভিতা দোকানটি অবস্থিত। মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায় ডোলসে ভিতা এর বাংলা মানে হচ্ছে সুইট লাইফ। এ দোকানের বিশেষত্ব হচ্ছে এরা অথেনটিক পিজ্জা এবং পাস্তা সার্ভ করে। এটার পাশাপাশি কিছু স্নাক্স পাওয়া যায় যেমন নাচোস। ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পিজা আছে এখানে এবং পাস্তার প্রাইস শুরু দেড়শ টাকা থেকে এবং সর্বোচ্চ ২৪০ টাকা। এখানে প্রত্যেকদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতারা ভিড় জমান। বর্তমানের খাবারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও কিছু খাবার আনার পরিকল্পনা আছে মালিকের। 

লি’ল স্পেস  

ডোলসে ভিতার ঠিক ডান পাশেই এ দোকানটির অবস্থান। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিভিন্ন রকমের চাইনিজ, মিল্ক শেক এবং পাস্তা টাইপের খাবার। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এখানকার খাবার ও রিজনেবল প্রাইসের ভেতর যেটা শুরু ১০০ টাকা থেকে এবং সর্বোচ্চ ৩০০ টাকায়। এই ফুডকোর্টের গ্রাহক প্রিয় খাবার হল পেরি পেরি রাইস প্লান্টার। কর্মকর্তারা বলেন প্রত্যেকদিন কমবেশি ৮০ থেকে ১০০ জন কাস্টমার হয় তাদের। এবং ভবিষ্যতে তাদের আরও একটি খাবার আনার পরিকল্পনা আছে যেটি হল সিজলিং।  

দা বার্গার সপ

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে দোকানদার বিশেষত্ব হচ্ছে বার্গার এবং মেনু কার্ড দেখলেও দেখা যাবে হরেক রকমের বার্গার আছে এদের কাছে। বার্গারের পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস এবং পটেটো ওয়েজেস ও আছে তাদের কাছে। তাদের মেনু ৯০ টাকা থেকে এবং সর্বোচ্চ আড়াইশো টাকার ভেতর। কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হলে তারা জানান প্রত্যেকদিনই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতারা বার্গার খেতে আসেন এখনে ।

লা প্লাটো-২

লা ফিয়েস্তা ঘুরে দেখা যাবে না লা প্লাটো নামের দুটি দোকান আছে। বাম দিক থেকে শুরু করলে প্রথম যে দোকানটি আছে সে টির বিশেষত্ব হচ্ছে কফি এবং প্লাটার নিয়ে এবং এখানেই খুলনার মধ্যে একমাত্র এবং সর্ব প্রথম আনা “সেলফি কফি” নামের একটি বিশেষ ধরনের কফি আছে যেটাতে আপনি যে কোন ধরনের ছবি কফির উপরে প্রিন্ট করতে পারেন, যেটি এডি বেল কালার দিয়ে করা। মেনু কার্ড থেকে দেখা যায় এখানে খাবারের দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০ টাকার ভেতর। দোকানে গ্রাহক প্রিয় খাবারের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে কর্মকর্তারা বলেন সব থেকে বেশি চলে গ্রিল এবং বারবিকিউ চিকেন প্লাটার এবং প্রত্যেক দিন অন্যান্য দোকানের মতো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহকের ভিড় হয় এখানে।

 

লা প্লাটো -১

 

লা প্লাটো প্রথম এবং আরেকটি সংস্করণ হল এটি। এ দোকানের বিশেষত্ব হচ্ছে বার্গার এবং সাব স্যান্ডউইচ, এছাড়াও এখানে পাওয়া যায় বিভিন্ন স্বাদের কোল্ড কফি এখানে খাবারের মূল্য সর্বনিম্ন ১৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা। বার্গার এর ১৩০-২৮০  ক্ষেত্রে স্যান্ডউইচ এর ক্ষেত্রে ১৫০-১৭০ প্লাটার ১৬০ এবং ১৭০ এবং পাস্তা ২০০ টাকা ও কোল্ড কফির মূল্য ৬০ টাকা। এ স্টলটিতে সবথেকে বেশি বিক্রিত হয় বার্গার এবং প্রত্যেকদিন কমবেশি ১০০ জনের মতো ক্রেতা ভিড় করে এখানে। কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হলে জানা যায় দুই সপ্তাহের মধ্যে আরেকটি ধরনের স্যান্ডউইচ আনা হবে এখানে। 

কাউন্টার নাইন 

এ দোকানের বিশেষত্ব হলো বিভিন্ন ধরনের অথেন্টিক প্লাটার ও চাইনিজ ফুড। খাবার ভেদে এগুলোর মূল্য হলো ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এ দোকানের গ্রাহক প্রিয় খাবারের মধ্যে আছে শ্রিম্প চিকেন গ্রেভি এবং প্রত্যেকদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতা ভিড় করে এখানে। দোকানের একজন মালিকের সাথে কথা বললে তিনি জানান ভবিষ্যতে লবস্টার এবং পিঁৎজা আনার পরিকল্পনা আছে তাদের ।

প্লেট 71 

এ দোকানের বিশেষত্ব হচ্ছে চাইনিজ, থাই, জাপানিজ, কোরিয়ান, এবং মিক্সড ইটালিয়ান যেটি দোকানের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়। খাবার ভেদে এগুলোর মূল্য হল ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এ দোকানের সব থেকে গ্রাহক প্রিয় খাবার হচ্ছে “রাইস বোউল” যেটা মালিকের বক্তব্যে জানা যায় এবং এটা ফুড কোর্ট গুলার মধ্যে সেরা বলে মন্তব্য করেন তিনি প্রত্যেকদিনই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক আসে এখানে যেটি ৮০ থেকে ১২০ এর ভেতর থাকে । ভবিষ্যতে দোকানের মালিকের পাস্তা সহ আরো কিছু ভিন্নধর্মী খাবার আনার পরিকল্পনা আছে ।

ড্রিংকস কর্নার 

লা ফিয়েস্তায় ঢুকে একদম হাতের ডানে ছোট যে দোকানটি চোখে পড়বে সেটি হলো ড্রিংস কর্নার। একটি মাত্র চেয়ার-টেবিল ও দুটি ফ্রিজ নিয়ে গঠিত হলেও বলা যেতে পারে সবগুলা কার্টের সব থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসটি পূরণ করে স্টলটি এবং সেটি হলো বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস বিক্রি করা। এগুলোর মধ্যে আছে কোক, স্প্রাইট, ফান্টা ও পানি। এ স্টলের কর্মকর্তার সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান খুব সুলভ মূল্যে ড্রিংকস বিক্রি করেন তিনি যেগুলোর কোন এক্সট্রা চার্জ নেই। 

পরিসমাপ্তি 

খুলনায় এমন একটি ফুড জোন থাকা আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। খুলনার উঠতি প্রজন্মের চাহিদার প্রয়োজনে খুলনায় যে ধরনের উন্নয়ন ঘটছে তার মধ্যে অন্যতম হলো লা ফিয়েস্তা, একমাত্র কিশোর-কিশোরীরাই নয় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সন্ধ্যার পর অনেকেই পরিবার-পরিজন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এখানে আনন্দের সাথে খাবার গ্রহণ করছে এবং একটি ভালো সময় কাটাচ্ছে। হয়তোবা এটিই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ খুলনার চিত্তবিনোদনের একটি উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি কোর্টেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ভিড় হয় এখানে এবং আমি আশাবাদী এই ধরনের প্রকল্প আমরা উৎসাহের সাথে ভবিষ্যতে উপভোগ করবো। তবে আমাদের সকলেরই লক্ষ্য রাখা জরুরি যে, আমাদের কোন ভুলের জন্য এই জায়গার সুন্দর পরিবেশটি যেন নষ্ট না হয়।

 

 

বিঃদ্র- লোকজনের ভীড়ে ও ভাল ক্যামেরার অভাবে ঠিক মত ছবি তুলতে না পারার জন্য এই প্রতিবেদক আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। হয়তোবা এই প্রতিবেদনটি আরো ভাল করে উপস্থাপন করা যেত, তবুও আশা করি পড়ে সবাই এখানে আসার আগ্রহ পাবেন। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *